ভোটারদের রায়কে থোড়াই পরোয়া। আপন স্বার্থসিদ্ধি আসল কথা। তার ওপর প্রলোভন থাকলে তো কথাই নেই। ২০ তৃণমূল সাংসদের পর ৬ জন উদ্ধবপন্থী শিবসেনা সাংসদ এখন বেসুরো। একনাথ শিন্ডের দলে ভিড়ে যাওয়ার পথে তাঁরা। তৃণমূল ভাঙার বাংলার মডেলে অপারেশন এখন মহারাষ্ট্রে। নেপথ্যে সর্বভারতীয় শাসকদল। শুধু সরকার গঠন করে যারা খুশি নয়। কেননা, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাই। নাহলে ডিলিমিটেশন বিল পাশ করানো যাচ্ছে না।
লোকসভার গত অধিবেশনে বিলটি পেশ করেও ঢোঁক গিলতে হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে ঘটনাটি মোটেই মর্যাদার ছিল না। আসন্ন অধিবেশনে কাঁটাটা উপড়ে ফেলতে তাই বিজেপি নেতৃত্ব মরিয়া। সেই চেষ্টার প্রথম পদক্ষেপ ছিল তৃণমূলে ভাঙন। ২০ জন তৃণমূল সাংসদ মূল দলের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়লেন। যোগ দিলেন অনামা দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় (এনসিপিআই)। ২০ জনের ওই কর্মকাণ্ডের প্রতিটি পদক্ষেপে জড়িয়ে ছিল বিজেপি।
সর্বভারতীয় শাসকদলের নেতা ভূপেন্দ্র যাদব, নিশিকান্ত দুবে ও বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন তাঁরা। এতে স্পষ্ট, যতই অন্য দলে যোগ দিন, অপারেশন ঘাসফুলের মূল কারিগর বিজেপিই। লক্ষ্য সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন। শুধু বাংলার সাংসদ ভাঙিয়ে সেই লক্ষ্যপূরণ সম্ভব নয় বলেই হাত পড়েছে উদ্ধবপন্থী শিবসেনায়। এই অপারেশনের কাঞ্চনমূল্য যে অনেক, তার আভাস দিয়েছেন উদ্ধব-ঘনিষ্ঠ সঞ্জয় রাউত।
তাঁর কথা সত্যি হলে, উদ্ধবের ঘর থেকে শিন্ডের ঘরে স্থানান্তরের মূল্য ১৫ কোটি টাকা। যঁারা টোপ গিলবেন, তাঁদের প্রাইভেট জেট দেওয়া হবে বলে খবর ভাসছে। একটি ঘটনায় তার ইঙ্গিতও আছে। ৬ জন উদ্ধবপন্থী সাংসদের প্রত্যেককে নয়াদিল্লিতে উড়িয়ে আনার জন্য বরাদ্দ ছিল আলাদা আলাদা চার্টার ফ্লাইট। তৃণমূলের ২০ জনকে অখ্যাত দলে ঢুকিয়ে দেওয়া গিয়েছে। শিবসেনার ৬ জনকে স্থান দিতে প্রস্তুত একনাথ শিন্ডে।
তিনি ও তাঁর ছেলে ইতিমধ্যে নয়াদিল্লি এসে উদ্ধবপন্থী ৬ জনের সঙ্গে বৈঠক সেরে ফেলেছেন। ওই ৬ জন শিন্ডের দলে ভিড়ে যেতে চেয়ে লোকসভার অধ্যক্ষকে চিঠিও দিয়েছেন। তাতেও অবশ্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাঙ্ক্ষিত দুই-তৃতীয়াংশ ছোঁয়া যাবে না। সেজন্য গেরুয়া শিবিরের নজর শারদ পাওয়ারের এনসিপি ও সমাজবাদী পার্টির দিকে। সেই অপারেশন ইতিমধ্যে জোরকদমে শুরু হয়ে গিয়েছে।
শেষপর্যন্ত যেভাবে হোক, দুই-তৃতীয়াংশের পথে সমস্ত বাধা হয়তো কূটকৌশলের বুলডোজারে পিষে ফেলা হবে। একইসঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর দিয়েও বুলডোজার চলার কাজটি চলবে। মহারাষ্ট্রের কথা যদি ধরা যায়, তাহলে উদ্ধবপন্থী শিবসেনা সাংসদরা জিতেছিলেন বিজেপি-বিরোধী ভোটের জোরে। বাংলায় এনসিপিআই-এ শামিল ২০ জন সাংসদও জয়ী হয়েছিলেন বিজেপি-বিরোধী প্রচারের পালে হাওয়া তুলে। বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে মানুষ মহারাষ্ট্র ও বাংলায় তাঁদের ভোট দিয়েছিল।
সেই ভোটারদের প্রতি বাংলার ২০ ও শিবসেনার (উদ্ধব) ৬ জন সরাসরি বিশ্বাসঘাতকতা করলেন। তৃণমূল ছেড়ে গেরুয়া শিবিরের কোলে আশ্রয় নেওয়ার জন্য তাঁরা নিজেদের ভোটারদের মতামত নেননি। হলফ করে বলা যায়, বিজেপির সমর্থন না থাকলে তাঁদের একজনেরও আর ভবিষ্যতে জিতে আসার সম্ভাবনা নেই। পদ্ম শিবিরের নানাবিধ সুখের প্রলোভনে তাঁরা কেউ জনমতের তোয়াক্কা করলেন না। গণতন্ত্রের মূল ধারণার প্রতি এর চেয়ে বড় কুঠারাঘাত আর কী হতে পারে!
দেশের জনতা গত লোকসভা ভোটে বিজেপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেয়নি। সেটাই ছিল জনতার রায়। তবুও কিছু শরিক দলের সমর্থনে তারা কেন্দ্রে সরকার গড়েছিল। তাতেও তারা সন্তুষ্ট না হয়ে দল ভাঙানোর খেলায় মরিয়া হয়ে নেমেছে। যে কায়দায় অন্য দল ভাঙানো চলছে, তাতে একদিকে প্রলোভন দেখানোর মতো অন্যায় ও নোংরা খেলা আছে। অন্যদিকে, গণতন্ত্রকে ক্রুশবিদ্ধ করা চলছে।

