নীতেশ বর্মন, শিলিগুড়ি: বিদ্যাভারতী মডেল (Vidya Bharati mannequin) কার্যকর করার সুপারিশ সরকারি ও সরকার পোষিত স্কুলে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) (RSS) সংগঠন অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ এই সুপারিশ করেছে। সুপারিশটি নিয়ে শিক্ষক সংগঠনটি রাজ্যের স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের সঙ্গে আলোচনাও করেছে ইতিমধ্যে। দীপক নিজেও সংঘের ঘনিষ্ঠ।
এই মডেল কার্যকর করা মানে আরএসএস পরিচালিত বিদ্যাভারতী স্কুলের পঠনপাঠনের নিয়ম থেকে শুরু করে আচার অনুশীলন ইত্যাদি অনুসরণ করা। নিঃসন্দেহে তাতে লক্ষ্য হিন্দুত্বের প্রচার ও প্রসার। বিদ্যাভারতী থাকতে অন্য স্কুলে এই মডেল কার্যকর করার সুপারিশ কেন? অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘের রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিক শুক্রবার সেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তাঁর কথায়, ‘জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের ঘটনা ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের অবক্ষয়ের ছবিটা স্পষ্ট করেছে। বিদ্যাভারতী স্কুলগুলিতে অনুসৃত নীতিগুলির গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। সেই ধ্যানধারণা রাজ্যের সব স্কুলে চালু করা জরুরি। সেজন্য আমাদের সংগঠন কাজ করবে।’ নিঃসন্দেহে জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষককে ক্যাম্পাসে ফেলে ছাত্রদের মার শোরগোল ফেলেছে সমাজে।
সেই পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবারই ওই স্কুলে গিয়ে অভিযুক্ত চার ছাত্রকে ট্রান্সফার সার্টিফিকেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন স্কুল শিক্ষামন্ত্রী। যদিও ওই ছাত্রদের অন্য স্কুলে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু আরএসএস-এর শিক্ষক সংগঠন মনে করে, শুধু এই পদক্ষেপে সামাজিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয় আটকানো যাবে না। সেজন্য সমাজে সাংস্কৃতিক সংস্কার প্রয়োজন। সেই সংস্কার শুধু বিদ্যাভারতী মডেলে আনা সম্ভব বলে সংগঠনটি মনে করছে।
সরকার এখনও সবুজ সংকেত না দিলেও সাংগঠনিক স্তরে সরকারি ও সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে এই মডেল কার্যকর করার বেশকিছু নির্দেশিকা দিয়েছে রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ। ইতিমধ্যে কিছু স্কুলে তা চালুও হয়েছে বলে সংগঠনটির দাবি। শৈক্ষিক মহাসংঘের রাজ্য কমিটির সাধারণ সম্পাদক মনে করেন, সাম্প্রতিক এই বিশৃঙ্খল আবহে রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলির সামাজিক পরিবেশ রক্ষা করতে কিছু নীতি কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি।
কেমন সেই নীতি। বাপির বক্তব্য, ‘আমাদের স্কুল, আমাদের তীর্থ অভিযানের মাধ্যমে শিক্ষায় ভারতীয় মূল্যবোধ ফিরিয়ে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে শ্রদ্ধাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’ সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে, বিদ্যাভারতী পরিচালিত স্কুলে শুধুমাত্র পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হয় না। শিশুর সর্বাঙ্গীন বিকাশে ভারতীয় সংস্কৃতির মূল্যবোধ রোপণ করা হয়। বিদ্যাভারতী মডেলের মূল ভিত্তি হল জাতীয়তাবাদ।
স্কুলের প্রবেশপথে থাকবে ভারতমাতার বিশাল প্রতিকৃতি। মন্দিরের আদলে তৈরি আবহাওয়ায় স্কুলে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে যেন ছাত্র ও শিক্ষকের মনে স্বতঃস্ফূর্ত ভক্তি ও দেশপ্রেমের ভাব জেগে ওঠে। প্রতিদিন প্রার্থনা সভা, সরস্বতী বন্দনা, বন্দে মাতরম এবং বৈদিক ভাবধারার অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শৃঙ্খলার পাঠ দেওয়া হবে, যা তাদের চারিত্রিক গঠনে সাহায্য করবে।
তবে শিক্ষক মহল এই সুপারিশে একমত নয়। শুধু বিদ্যাভারতী মডেলে সমস্যার সমাধান হবে বলে সব শিক্ষক মনে করেন না। শিলিগুড়ি কলেজের অধ্যাপক সত্যরঞ্জন রায়ের কথায়, ‘শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ সুস্থ রাখতে পরিচ্ছন্নতা, পরিকাঠামো, ছাত্র-শিক্ষকের উপযুক্ত অনুপাত ও শিক্ষকদের যোগ্যতা সমানভাবে থাকা জরুরি। তবেই অবক্ষয় রোধ হতে পারে।’
নকশালবাড়ি নন্দপ্রসাদ হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক কাজল দে আবার সতর্ক করেছেন, ‘নীতি বদল প্রয়োজন ঠিকই। কিন্তু ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক ফেরানোর নাম করে আমরা যেন কিছু চাপিয়ে না দিই।’ নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির দার্জিলিং জেলা সম্পাদক বিদ্যুৎ রাজগুরু একধাপ এগিয়ে অভিযোগ করেন, ‘শিক্ষা ব্যবস্থায় গৈরিকীকরণের চেষ্টা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যার প্রভাব ভয়ংকর হতে পারে।’
শৈক্ষিক মহাসংঘের নেতা বাপি জানেন, তাঁদের প্রস্তাবের ভুল ব্যাখ্যা হতে পারে। কিছু শিক্ষক সংগঠন বাধা দিতে পারে। সেই বাধা কাটাতে শিক্ষকদের মানসিকতার বদল আনা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। তাঁর কথায়, ‘শিক্ষকরা বিদ্যালয়কে নিছক কর্মক্ষেত্র না ভেবে তীর্থক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করবেন। এতে শিক্ষকদের দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা কমে, নিয়মিত স্কুলে আসা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে ক্লাস নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়।’

