জিত যার যার, কিন্তু উদয়ন হারলে উৎসব সবার। মঙ্গলবার দিনহাটার ছবিটা অন্তত সেটাই বলেছে। উদয়ন গুহ হেরে যাওয়ায় মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিয়েছে জনতা। এদিকে, জনরোষের ভয়ে মাঝরাতেই পালিয়ে গিয়েছেন দিনহাটার বেতাদ বাদশা।
শুভঙ্কর চক্রবর্তী
সময়ের চাকা বোধহয় একেই বলে! ভোটগণনা শুরুর আগেও মন্ত্রিত্বের দম্ভে যে মানুষটির মাটিতে পা পড়ত না, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যিনি দিনহাটাতে কার্যত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই বাহুবলী নেতা উদয়ন গুহ (Udayan Guha Flees Dinhata) ভোটে হারার পর জনরোষের ভয়ে মাঝরাতে চুপিসারে দিনহাটা (Dinhata) ছেড়ে পালিয়ে গেলেন। পুলিশ সূত্রের খবর, চারটি গাড়িতে বাক্স-প্যাটরা গুছিয়ে স্ত্রী, ছেলে, বৌমা ও নাতিকে নিয়ে সোমবার রাত ৩টে নাগাদ দিনহাটা ছাড়েন উদয়ন। তার আগে ভয়ে বাড়ি ছেড়ে কয়েকঘণ্টা দিনহাটা থানায় বসে ছিলেন বিদায়ি মন্ত্রী। পুলিশের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, বিপদ বুঝে সন্ধ্যা হতেই গা-ঢাকা দেন উদয়নের ছেলে সায়ন্তন। রাত দশটা নাগাদ দিনহাটা থানায় ঢুকে পড়েন উদয়ন। শহর ছাড়তে চেয়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা চান তিনি। সেসময় নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয় জানানোয় ভয়ে রাত আড়াইটে পর্যন্ত থানাতেই বসে থাকেন মন্ত্রী। তারপর কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে বাড়ি ফেরেন তিনি। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে বেরিয়ে যান। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের তিনটি গাড়ি উদয়নের গাড়িগুলোকে নিরাপত্তা দেয়।
দিনহাটা থেকে কোচবিহার হয়ে যাওয়ায় সমস্যা হতে পারে, সেই ভয়ে ঘুরপথে বাড়ি ছাড়েন উদয়ন। দিনহাটা থেকে গোসানিমারি, সিতাই, শীতলকুচি হয়ে মাথাভাঙ্গায় গিয়ে ওঠে মন্ত্রীর কনভয়। সেখান থেকে চ্যাংরাবান্ধা হয়ে পরিবার সহ শিলিগুড়ি পৌঁছান মন্ত্রী। পুলিশ সূত্রের খবর, শিলিগুড়ি থেকে মহারাষ্ট্রে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। শেষপর্যন্ত তিনি কলকাতা না মহারাষ্ট্র কোথায় গিয়েছেন তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। একাধিকবার ফোন করলেও সাড়া দেননি উদয়ন বা তাঁর ছেলে। এর আগে বিভিন্ন নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের অনেক দাপুটে নেতা, মন্ত্রী পরাজিত হয়েছেন, তবে উদয়নের মতো ভয়ে রাতের অন্ধকারে বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়নি কাউকেই। স্থানীয়রা বলছেন, তাঁর বিরুদ্ধে যে প্রবল জনরোষ তৈরি হয়েছিল ভালোভাবেই তার আঁচ পেয়েছিলেন মন্ত্রী। তাই তিনি পালিয়ে গিয়েছেন। উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রীর এমন করুণ পরিণতি দেখে দিনহাটার আমজনতা এখন মুচকি হাসছে। যে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দিনরাত গালমন্দ করতেন উদয়ন, পালানোর সময় সেই কেন্দ্রীয় বাহিনীই ছিলেন তাঁর রক্ষাকর্তা।
কুকথার জন্য কটাক্ষ করে অনেকেই উদয়নকে ‘উত্তরবঙ্গের অনুব্রত’ বলতেন। ক’দিন আগে পর্যন্ত কথায় কথায় হুমকি দেওয়াটা দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল কমল-তনয়ের। দিনহাটার মাটিতে দাঁড়িয়ে কেউ তাঁর বা তাঁর দলের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটুকু করার সাহস পেতেন না। যদি কেউ সেই দুঃসাহস দেখাতেন, তবে তাঁর আর রক্ষে ছিল না। প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে বিরোধীদের হাঁটু ভেঙে দেওয়ার নিদান দেওয়া থেকে শুরু করে, প্রতিবাদীদের এলাকাছাড়া করার হুমকি- সবই ছিল তাঁর চেনা বুলি। তাঁর পুরোনো দল ফরওয়ার্ড ব্লকের দীর্ঘদিনের সতীর্থ প্রবীণ নেতা অক্ষয় ঠাকুরকে রাস্তায় কান ধরে হিসেব বোঝানোর হুমকি দিতেও পিছপা হননি উদয়ন। বিধানসভার ভেতরেই তিনি অন্য দলের বিধায়কের পা ভেঙে দেওয়ার কথা বলতেও দ্বিধাবোধ করেননি। বিরোধী মতপ্রকাশ করলে সঙ্গে সঙ্গেই সেই কণ্ঠরোধ করতে দলবল পাঠিয়ে দেওয়া হত। কারও বাড়ি ভাঙচুর করা, কারও বা দোকান লুট করা, আবার কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া, এসব দিনহাটার রোজনামচায় পরিণত হয়েছিল। উদয়ন হয়ে উঠেছিলেন দিনহাটার ত্রাস। তাঁর মুখের কথাই ছিল অলিখিত আইন। পুলিশের সামনেই বিরোধীদের হুমকি দেওয়া এবং সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখাই ছিল তাঁর নগ্ন দম্ভের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর দাপটে সাধারণ মানুষ এতটাই অতিষ্ঠ ছিলেন যে, বাধ্য হয়ে অনেকেই মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করতেন। তিনি নিজেকে দিনহাটার ভাগ্যবিধাতা বলে মনে করতে শুরু করেছিলেন।
একা রামে রক্ষে নেই, সুগ্রীব দোসর-এর মতো উদয়নের সঙ্গে জুটেছিলেন তাঁর ছেলে। বাবার মন্ত্রিত্বের দম্ভে দিনহাটায় রীতিমতো গুন্ডাবাহিনী তৈরি করে ফেলেছিলেন সায়ন্তন। দিনরাত সেই বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখাতে শুরু করেছিলেন তিনি। বাবা-ছেলের দাপটে তিতিবিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন সাধারণ মানুষজন। তাঁদের ভেতর কতটা ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল মঙ্গলবার সকালে তা চাক্ষুস করেছেন দিনহাটাবাসী। এদিন সকাল থেকেই দিনহাটা চৌপথি বড় শিব মন্দির, থানা মন্দির, মদনমোহন মন্দিরে পুজো দিতে ভিড় জমান বহু মানুষ। তাঁদের বেশিরভাগই জানিয়েছেন, উদয়নের হারের জন্য মানত করেছিলেন তাঁরা। মানত পূরণ হওয়ায় পুজো দিতে এসেছেন। এদিন সকালে কলেজপাড়ার বুড়িমাতার মন্দিরে পুজো দিতে এসেছিলেন রতনকুমার সরকার। তাঁর কথায় ক্ষোভ ঝরে পড়েছে, ‘উদয়নের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেতে পাঁচ বছর আগেই মানত করেছিলাম। এখন আমরা শান্তিতে শ্বাস নিতে পারব।’ বড়শাকদল থেকে এসে এদিন বড় শিব মন্দিরে পুজো দেন একদল তরুণ। তাঁদের একজন অমর দাসের কথা, ‘ভাড়া করা গুন্ডা নিয়ে আমাদের উপর অনেক অত্যাচার করা হয়েছে। ভয়ে শুধু মহাদেবকে ডেকেছি। ভগবান আমাদের কথা শুনেছেন।’
ভোটের ফল (West Bengal Election Outcome 2026) প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তাসের ঘরের মতো হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছে উদয়নের এতদিনের সাজানো অহংকারের সৌধ। যে জনতাকে তিনি এতদিন ভয় দেখিয়ে এসেছেন, সেই জনতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর ন্যূনতম সাহসটুকুও তাঁর আর অবশিষ্ট ছিল না। তাই অপরাধীর মতো, মুখ লুকিয়ে পৈতৃক ভিটে ছাড়তে হল উদয়নকে। ক্ষমতার আস্ফালন যে ঠিক কতটা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, সোমবার রাতের নিস্তব্ধ দিনহাটা তারই এক জ্বলন্ত প্রমাণ হয়ে রইল। মঙ্গলবার সকালে উদয়নের পালানোর খবর ছড়িয়ে পড়তেই দিনহাটায় অঘোষিত উৎসবের মেজাজ দেখা যায়। এতদিন ধরে চলা ভয়ের রাজত্বের অবসান ঘটায় আপাতত দিনহাটা যেন মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে।
