সায়নদীপ ভট্টাচার্য, বক্সিরহাট: রাজ্যে পালাবদলের পর দুর্নীতির অভিযোগ তুলে একের পর এক সংঘের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছিল বিজেপি। আর তার জেরে চরম সমস্যায় পড়েছেন তুফানগঞ্জ-২ ব্লকের অধিকাংশ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা (Tufanganj)। অভিযোগ, সংঘের সিএসপিদের কাটমানি না দিলে মিলত না ব্যাংক ঋণের সুপারিশ। এছাড়া বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুযোগসুবিধার ক্ষেত্রেও সংঘের বিরুদ্ধে স্বজনপোষণের অভিযোগ ওঠে। রাজ্যে পালাবদলের পর সেই সংঘের কমিটি পরিবর্তনের দাবিতে একাধিক কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সরকারি জটিলতার কারণে এখনও সংঘের কমিটির নির্বাচন সম্ভব হয়নি। যেহেতু আর্থিক ঋণের ক্ষেত্রে সংঘের অনুমতি বাধ্যতামূলক, তাই সংঘের কার্যালয় বন্ধ থাকায় সেই অনুমতি মিলছে না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষও স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের ঋণ দিতে অস্বীকার করছে। আর তাতেই সংঘের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন খোদ স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা।
তুফানগঞ্জ-২ পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য পার্বতী সাহা বলেন, ‘সংঘের অনুমতি ছাড়া ঋণ মিলছে না বলে প্রতিদিন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা ফোন করছেন। বিডিও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কিছু ঋণ পাশ করিয়েছেন। এতে সমস্যা পুরোপুরি মিটছে না। আমরা আমাদের বিধায়ক তথা এই দপ্তরের মন্ত্রী মালতী রাভাকে বিষয়টি জানাব। তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’ ব্লক প্রশাসনের এক আধিকারিক জানান, সংঘের নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়টি জেলা থেকেই পরিচালিত হয়। সমস্যা মেটাতে সবরকম চেষ্টা চলছে।
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর দলের ঋণের ক্ষেত্রে সংঘের সিএসপিদের সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। এমনকি, দলের সদস্যদের কারও ব্যক্তিগত ঋণের প্রয়োজন হলে তা দিতে পারেন সংঘের সভানেত্রীরা। সেই সুযোগে ঋণের অনুমতি দেওয়ার নামে কোথাও কোথাও সংঘের বিরুদ্ধে সদস্যদের দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে ভোটপ্রচার করানোর অভিযোগ উঠেছে। আবার কোথাও সংঘের সিএসপি এবং সভানেত্রীদের বিরুদ্ধে আর্থিক তছরুপের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, ঋণের আবেদন করতে হলে বা নতুন দল গঠন করতে সংঘের সভানেত্রীদের মোটা টাকা কমিশন দিতে হত। এমনকি মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর জন্য সরকারি প্রকল্পের সুযোগসুবিধাও সংঘের নেত্রীরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতেন। খুব বেশি হলে সভানেত্রীর ঘনিষ্ঠ কোনও স্বনির্ভর গোষ্ঠী সেই সুবিধা পেত।
আরও অভিযোগ, স্কুল ইউনিফর্ম তৈরির জন্য সরকারিভাবে সমস্ত মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও শেষপর্যন্ত গোষ্ঠীগুলিকে অন্ধকারে রেখে সংঘের সভানেত্রীরা মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে বহিরাগত এজেন্সিকে দিয়ে ইউনিফর্ম তৈরি করিয়েছেন।
এমনই একাধিক গুরুতর অভিযোগে মহিষকুচি-১ ও ২, শালবাড়ি-১ ও ২ এবং বারকোদালি-১ গ্রাম পঞ্চায়েতে সংঘের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে পথে নেমেছিলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরা। কমিটি পরিবর্তনের দাবিতে বিডিও দপ্তরে লিখিত অভিযোগও জানানো হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এইসব সংঘের নির্বাচন সম্ভব হয়নি।
এদিকে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের ব্যাংক ঋণ কিংবা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য সংঘের সভানেত্রী বা সংশ্লিষ্ট সিএসপি’র সুপারিশ বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংঘের কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় সেই অনুমোদন মিলছে না। ফলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষও ঋণ মঞ্জুর করতে অস্বীকার করছে। এতে ব্যবসা সম্প্রসারণ, কৃষিকাজ বা ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য ঋণের ওপর নির্ভরশীল বহু মহিলা সদস্য চরম সমস্যায় পড়েছেন।
শালবাড়ি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা রিতা সূত্রধর বলেন, ‘একটি দলের জন্য প্রাথমিক দশ লক্ষ টাকা ব্যাংক ঋণ দেয়। সেক্ষেত্রে সাক্ষী হিসেবে সংঘের সিএসপিদের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। যদি সদস্যদের কারও ব্যক্তিগত ঋণ প্রয়োজন হয় তবে, সংঘের অ্যাকাউন্ট থেকে ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত সভানেত্রীরা ঋণ দিতে পারেন। কিন্তু সংঘের কার্যালয় বন্ধ থাকায় এখন কোনও ঋণ মিলছে না। আমরা রাজনীতি বুঝি না, শুধু চাই আমাদের কাজ হোক। ঋণ না পেয়ে অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন।’
শালবাড়ি-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের এক স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য মমতা বর্মন বলেন, ‘সংঘের থেকে ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে ঘরের কাজ করব বলে ভেবেছিলাম। গত কয়েকদিন ধরে কাগজপত্র নিয়ে ঘুরছি। কিন্তু কার্যালয় বন্ধ থাকায় সংঘের কমিটির কারও দেখা মিলছে না। এদিকে যে ব্যাংক থেকে দলের হয়ে ঋণ তুলব তারাও সিএসপি-র স্বাক্ষর না থাকায় ঋণ দিতে নারাজ।’
শালবাড়ি-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য মায়া সরকার বলেন, ‘দুর্নীতির অভিযোগে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যরাই সংঘের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়েছিলেন। আমাদেরও দাবি সংঘের কমিটি পরিবর্তনের। বর্তমান পরিস্থিতিতে সংঘের অনুমতি ছাড়া আর্থিক ঋণ মিলছে না। দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আমরা বিডিওর দ্বারস্থ হয়েছি।’

