উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: বিশ্ব বাণিজ্য ও ভূ-রাজনীতির জল মাপার খেলা নতুন মোড় নিল হোয়াইট হাউসের (White Home) একক সিদ্ধান্তে। মার্কিন আইনসভা বা কংগ্রেসে গৃহীত একটি বিলে সই করার ঠিক এক মাস পর, শেষ মুহূর্তে এসে রাশিয়া সংক্রান্ত একাধিক কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকর করা স্থগিত করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Trump waives tariffs)। নির্ধারিত সময়সীমা ১৮ অক্টোবর শেষ হওয়ার ঠিক একদিন আগে, এই সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে সই করেন তিনি। এই অভাবনীয় পদক্ষেপে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে দিল্লি ও বেজিং, কারণ ওই বিলে রুশ অপরিশোধিত তেল কেনা শীর্ষ পাঁচ দেশ—ভারত, চিন, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি ও আজারবাইজানের ওপর শতভাগ পর্যন্ত শুল্ক চাপানোর সংস্থান রাখা হয়েছিল।
আমেরিকাকে অর্থনৈতিক ঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত—এমনটাই দাবি ট্রাম্প প্রশাসনের। নিজের নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, “আমি এতদ্বারা গ্রাহাম অ্যাক্ট (Graham Act)-এ উল্লিখিত নিষেধাজ্ঞা, বিধিনিষেধ এবং শুল্কগুলোর প্রয়োগ থেকে অব্যাহতি দিচ্ছি। আমি কংগ্রেসের কাছে একটি সনদ জমা দিয়েছি, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান সময়ে এই ধরনের অব্যাহতি প্রদান করা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল।” তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ছাড় স্থায়ী নয়; কেবল প্রয়োগ প্রক্রিয়াটি আপাতত ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যার অর্থ রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে পরবর্তীতে যেকোনো সময় এটি চালু করতে পারেন।
উৎসে তাকালে দেখা যায়, প্রয়াত সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের স্মৃতি বিজড়িত ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ আইনটি মূলত ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর কোষাগার খালি করতেই তৈরি হয়। কিয়েভ সফর থেকে ফেরার পরই গত জুলাই মাসে মৃত্যু হয় ট্রাম্পের এই ঘনিষ্ঠ সমর্থকের। এই আইনে রাশিয়া থেকে শক্তি আমদানিতে ৫০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপানো সহ ভ্লাদিমির পুতিন ও উচ্চপদস্থ কর্তাদের ওপর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞার বন্দোবস্ত ছিল। এমনকি রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা ১০টি দেশের বিরুদ্ধে শতভাগ শুল্কের যে খাঁড়া ঝুলছিল, তা ভারতের ক্ষেত্রে মারাত্মক ধাক্কা হতে পারত।
উল্লেখ্য, বাধ্যতামূলক শ্রম ব্যবহারে অভিযুক্ত পণ্যের কারণে ইতিমধ্যেই ভারতের ওপর আমেরিকায় ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক রয়েছে, তার ওপর শতভাগ চাপলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠত। এর আগে গত বছর রুশ তেল কেনার কারণে বাড়তি ২৫ শতাংশ এবং দ্বিপাক্ষিক ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপায় দিল্লি-ওয়াশিংটন সম্পর্কে তিক্ততা বাড়ে, যা পরবর্তীতে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক এই টানাপোড়েনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবরই স্পষ্ট নীতি বজায় রেখেছে। দেশের ১৪০ কোটি নাগরিকের জন্য সস্তায় জ্বালানি সুনিশ্চিত করতে যে বাজার দর অনুযায়ী তেল কেনা অব্যাহত থাকবে, তা আমেরিকা সফররত প্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার স্পষ্ট করেছে দিল্লি। এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে রূপ নিল যখন মস্কোর দিকে ট্রাম্পের সুর আগের চেয়ে নরম। সম্প্রতি ৩ লাখ টনেরও বেশি রুশ ডিজেল আমদানির চুক্তি সই করেছে আমেরিকা, যার তীব্র সমালোচনা করে ইউক্রেনীয় রাষ্ট্রপতি ভালোদিমির জেলেনস্কি এটিকে “unworthy of our companions” এবং “weak decision” বলে তোপ দাগেন। পালটা জবাবে ইউক্রেনে নতুন নেতৃত্ব আনার পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়ে ট্রাম্প জানান, “আমার পরামর্শ হলো, তাদের এমন একজন নতুন নেতা পাওয়া উচিত যিনি সমঝোতা করতে পারেন। কোনো এক কারণে (জেলেনস্কি) কখনোই তা করেন না।”

