উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: আমাদের সাধারণ ধারণা দাঁত (Tooth) শুধু চিবিয়ে খেতে সাহায্য করে এবং সৌন্দর্য বাড়ায়। খারাপ দাঁত থাকলে অথবা দাঁত না থাকলে আমাদের শরীরের যে কতটা ক্ষতি হতে পারে, সে ধারণা আমাদের নেই। কিন্তু আদতে দাঁত ও মাড়ির রোগের জন্য আমাদের শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি হতে পারে। লিখেছেন দন্তবিশেষজ্ঞ ডাঃ দেবাশিস দেবনাথ।
ভালো/খারাপ ব্যাকটিরিয়া
মুখ দিয়ে আমরা খাবার খাই- তাই এটাই আমাদের শরীরের প্রধান প্রবেশদ্বার ধরে নেওয়া যেতে পারে। খাবারের সঙ্গে অথবা সাধারণভাবে মুখে প্রচুর পরিমাণ ব্যাকটিরিয়া পাওয়া যায়। যার মধ্যে কিছু ভালো ব্যাকটিরিয়া থাকে, যারা খাবার পরিপাকে সাহায্য করে পাকস্থলির কার্যকারিতা বাড়ায়। আর প্রচুর খারাপ ব্যাকটিরিয়া থাকে, যারা সুযোগসন্ধানী মানে সুযোগ পেলে আমাদের মুখে জমে থাকা খাবারের সহযোগিতায় দাঁত ও মাড়ি খারাপ করতে শুরু করে। এইসব খারাপ ব্যাকটিরিয়া কোনওভাবে আমাদের রক্তের মধ্যে ঢোকার চেষ্টা করে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে যায়। যাঁদের মুখের স্বাস্থ্য ভালো তাঁদের ক্ষেত্রে এইসব ব্যাকটিরিয়া খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। মুখের থুতু প্রহরীর মতো এইসব খারাপ ব্যাকটিরিয়াকে রক্তের সঙ্গে মিশতে বাধা দেয়।
দাঁতের ক্ষয়
দাঁত ও মাড়ির সমস্যা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে এইসব খারাপ ব্যাকটিরিয়া প্রচণ্ড পরিমাণে সক্রিয় হয়ে যায়। মাড়ির ভিতরের রক্তনালিগুলো খুব পাতলা থাকে যার জন্য সামান্য সংক্রমণে হালকা চাপ পড়তেই মাড়ির ভিতর থেকে রক্ত পড়া শুরু হয়, যাকে আমরা পিরিওডোনটাইটিস বলি। দাঁতের ক্ষয় বা ক্যাভিটি খারাপ ব্যাকটিরিয়া সক্রিয় হওয়ার লক্ষণ- এই ক্ষয় যখন দাঁতের ভিতর পর্যন্ত চলে যায় তখন দাঁতের ভিতরে থাকা রক্তনালির সঙ্গে মিশে গিয়ে ব্যাকটিরিয়াগুলো প্রধান রক্তনালির ভিতরে গিয়ে পৌঁছায়।
হার্ট ব্লকেজে দাঁতের ব্যাকটিরিয়া
অদ্ভুতভাবে গত কয়েক বছর ধরে অল্পবয়স্কদের হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা অনেক বেড়ে গিয়েছে। বিভিন্ন দেশে অনেকরকম পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, হার্ট ব্লকেজের জায়গায় একইরকম ব্যাকটিরিয়া পাওয়া গিয়েছে যেটা দাঁতের ক্ষয় অথবা মাড়ির রোগ হলে দেখা যায়। হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত রোগীর মুখ পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে তাঁদের একাধিক দাঁত বা মাড়ির সমস্যা আছে যার কোনও চিকিৎসা হয়নি। এই নিয়ে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা একই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, হার্ট ব্লকেজ বা হার্ট অ্যাটাকের অন্যান্য কারণের সঙ্গে দাঁত ও মাড়ির সংক্রমণ হার্টের বড় ক্ষতি করতে পারে। এমনকি হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
ডায়াবিটিস
ডায়াবিটিসের সঙ্গে মাড়ির সংক্রমণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ আছে। মাড়ির প্রদাহ হলে সেখানে উপস্থিত ব্যাকটিরিয়া শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে একটা ইনফ্ল্যামাটরি এনভায়রনমেন্ট তৈির করে যা রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আশ্চর্যজনকভাবে দেখা গিয়েছে, মাড়ির চিকিৎসা হওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা অনেকটাই কমে যায়।
গর্ভাবস্থায় সমস্যা
গর্ভাবস্থায় মহিলাদের শরীরে হরমোনজনিত বিভিন্নরকম পরিবর্তন হয়। ফলে সাধারণভাবে মাড়ির সমস্যা তৈরি হতে পারে। এই অবস্থায় কারও যদি আগে থেকেই মাড়ির সমস্যা থাকে তাহলে তা গর্ভাবস্থা চলাকালীন অনেক গুণ বেড়ে যায়। মাড়িতে উপস্থিত খারাপ ব্যাকটিরিয়া গর্ভস্থ বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। মিসক্যারেজ বা প্রিম্যাচিওর ডেলিভারির জন্য অন্যান্য কারণের সঙ্গে মাড়িতে উপস্থিত খারাপ ব্যাকটিরিয়া অনেক অংশেই দায়ী। সেজন্য পরিকল্পিত গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে আমরা সবসময় মুখে উপস্থিত খারাপ দাঁত বা মাড়ির সমস্যা থাকলে গর্ভধারণের আগেই তার চিকিৎসা করার পরামর্শ দিয়ে থাকি।
ইমিউনিটির তারতম্য
মুখে উপস্থিত খারাপ ব্যাকটিরিয়া আমাদের ইমিউনিটির তারতম্য ঘটায়। সেজন্য বিভিন্ন অটোইমিউমন সমস্যায় দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ছয় মাসে চেকআপ
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা দাঁতে ব্যথা হলেই ডাক্তার দেখাতে যাই। ডাক্তারবাবুকে বলি দু’একদিন আগে অবধি কোনও ব্যথা ছিল না। হঠাৎ করে শুরু হয়েছে।– একটা দাঁত ক্ষয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে ব্যথা হতে কম করে এক বছর সময় লাগে। অর্থাৎ সেইসব খারাপ ব্যাকটিরিয়া সেই দাঁতে এক বছর ধরে ঘর বানিয়ে রেখেছে। মাড়ির ক্ষেত্রে যতক্ষণ মাড়ি থেকে রক্ত পড়া অথবা দাঁত নড়া শুরু না করে ততক্ষণ আমরা কোনও চিকিৎসার কথা ভাবি না। আমাদের এই অলসতা থেকে বের হতে হবে। প্রত্যেক ছয় মাসে একবার দাঁতের চেকআপ করানো প্রয়োজন।
আরও যা করবেন –
- মুখে কোনওরকম ভাঙা বা পচা দাঁত রাখা চলবে না। যদি তা চিকিৎসা করে রাখা যায় তাহলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করতে হবে আর চিকিৎসা করে রাখা সম্ভব না হলে তুলে নেওয়া উচিত।
- মাড়ির সমস্যা হলে চিকিৎসা করে ঠিক করে নিতে হবে। শুধু পেস্ট পালটে মাড়ির সমস্যা ঠিক হয় না।
- দু’বেলা দাঁত মাজা প্রয়োজন– রাতে খাবার পর ও সকালে ব্রেকফাস্টের পর। ব্রাশ করে দুই দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাবার পরিষ্কার হয় না সেই জন্য ডেন্টাল ফ্লস ব্যবহার করতে হবে।
- বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ঘুমের আগে বা ঘুমের মধ্যে দুধ খাওয়ানো বন্ধ করতে হবে। এতে খুব তাড়াতাড়ি দাঁতে ক্যাভিটি হয়।
- বাবা–মায়ের সঙ্গে একই থালা বা চামচে বাচ্চাদের খাওয়ানো উচিত নয়। এতে বাবা-মা অথবা বড়দের দাঁতে বা মাড়িতে উপস্থিত খারাপ ব্যাকটিরিয়া বাচ্চার মুখে যেতে পারে।
- বেশি করে সবজি জাতীয় খাবার খাওয়া উচিত। তাহলে আমাদের দাঁত নিজেই কিছুটা পরিষ্কার হয়। থুতুর মধ্যে প্রচুর পরিমাণ এনজাইম এবং অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল এজেন্ট আছে। তাই বেশিক্ষণ ধরে চিবোলে থুতুর নিঃসরণ বেশি করে হবে যা খারাপ ব্যাকটিরিয়াকে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ দেয় না।
- মিষ্টি জাতীয় খাবার আমাদের প্রধান খাবার (লাঞ্চ, ডিনার)-এর মাঝে খেলে ভালো। তাতে অন্যান্য খাবারের চাপে তা আর দাঁতে লেগে থাকবে না।
যদি আপনার দাঁত হারান, তাহলে আপনার জীবনও হারাতে পারেন। সুস্থ্, স্বাভাবিক ও নীরোগ জীবনের জন্য ঠিকমতো চিবিয়ে খাবার ভূমিকা অপরিসীম। তাই মুখের স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য আমাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।
