কলকাতা: তৃণমূলের অডিট রিপোর্ট (TMC Audit Report) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিমান-বিলাসে’র অভিযোগে সিলমোহর দিয়ে দিল। নির্বাচন কমিশনের কাছে পেশ করা ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, গত চার বছরে বিমান ও হেিলকপ্টার ভাড়া বাবদ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা খরচ করে ফেলেছে তৃণমূল। এই খরচের বেশিরভাগটাই অভিষেকের সফরের জন্য। শুধু নির্বাচনি প্রচারের কারণে নয়, কলকাতা-নয়াদিল্লি যাতায়াতেও তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক চার্টার্ড বিমান ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ।
সদ্য দলের যে অডিট রিপোর্ট সামনে এসেছে, তাতে ২০২২-এ বিমান ভাড়া করতে তৃণমূল খরচ করেছিল ৩৫ কোটি টাকার বেশি। ২০২৩-এ সেই খরচ ছিল প্রায় ১৩ কোটি টাকা। কিন্তু ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষে সেই ব্যয় লাফিয়ে বেড়ে হয়েছিল ৫৬ কোটি টাকারও বেশি। পরের অর্থবর্ষ ২০২৪-’২৫ সালে ওই খরচের পরিমাণ ছিল ৩৭ কোটি টাকার কাছাকাছি। এই বছরটিতে লোকসভা নির্বাচন ছিল। তার আগের বছর ২০২৩-এ মেঘালয় ও ত্রিপুরার ভোটেও তৃণমূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
নির্বাচনের সময় ছাড়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় খুব বেশি দলের টাকায় ভাড়া করা বিমানে চড়েননি। তখন রাজ্য সরকারের বিমানে তিনি যাতায়াত করতেন। কিন্তু ভোট থাকুক বা না থাকুক, অভিষেকের যাতায়াত সবসময়ই ভাড়া করা বিমানে ও হেলিকপ্টারে হত বলে অভিযোগ। অন্য আঞ্চলিক দলগুলি বিমান বা হেলিকপ্টার বাবদ যা খরচ করে, তৃণমূলের ব্যয় তার চেয়ে অনেক বেশি। যা শুধু অভিষেকের জন্যই।
সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পরেও তিনি চার্টার্ড বিমানে কলকাতা-দিল্লি যাতায়াত করেছেন বলে অভিযোগ নিয়ে তৃণমূলে হইচই হয়। লোকসভার অধ্যক্ষের ডাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে শুক্রবারও তিনি চার্টার্ড বিমানে গিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। তাতে এমনকি দলের কালীঘাট শিবিরের প্রথম সারির ঘনিষ্ঠদের অন্যতম কুণাল ঘোষ কড়া মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘দলের টাকায় চার্টার্ড ফ্লাইটে চড়লে, সেটাকে সমর্থন করি না।’
অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল মোট প্রায় ৮২ কোটি টাকা খরচ করেছিল। ওই খরচের অর্ধেকেরও বেশি ৪৬ কোটি ছিল বিমান ভাড়া বাবদ। যা মোট খরচের ৫৬ শতাংশ। ওই একই নির্বাচনে বিজেপি গোটা দেশে বিমান ভাড়ায় ব্যয় করেছিল ১৭৪ কোটি টাকা। একটি রাজ্যের হিসাব ধরলে বিজেপির খরচকে ছাপিয়ে গিয়েছে তৃণমূলের বিমান ভাড়া।
অভিষেক অবশ্য শুক্রবারই এই অভিযোগ সম্পর্কে নিজের সাফাই দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘যাঁরা এসব বলছেন, তাঁরা যদি লিখিত দেন, তবে আমি ইকনমি ক্লাসে যাতায়াত করব।’ সাংসদ হিসেবে অবশ্য তিনি যাত্রীবাহী বিমানের বিজনেস ক্লাসে যাতায়াতের ভাড়া পান সরকারের কাছ থেকে। ইতিমধ্যে বিক্ষুব্ধ বিধায়কদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ তৃণমূলের তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেন বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
২০২৪-’২৫ অর্থবর্ষ ধরলে অবশ্য তৃণমূলের নির্বাচনি ব্যয় ছিল প্রায় ১৩৭ কোটি টাকা। যার ২৭ শতাংশ খরচ হয়েছিল বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়া করতে। বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে, দলের নির্বাচনি খরচের প্রতি ৪ টাকার ১ টাকা লেগেছে আকাশপথে অভিষেকের চলাচল বাবদ। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা তথা তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ শিবিরের প্রধান ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও চার্টার্ড বিমান ব্যবহারের জন্য কড়া সমালোচনা করেছেন।
তাঁর ভাষায়, ‘এখন দলের শয়ে-শয়ে কর্মী আক্রান্ত। তাঁদের মামলা লড়ার টাকা নেই। বাগনানে সোনা বন্ধক রেখে দলের কর্মীদের মামলার খরচ মেটাচ্ছেন অরুণাভ সেন। কর্মীরা লড়বেন আর চার্টার্ড ফ্লাইটে চড়ে কেউ স্ট্যাটাস বাড়াবেন, এটা হয় না।’ দলীয় তহবিল নিয়ে ডামাডোলের মধ্যে বিমান ভাড়ায় রাজকীয় খরচের অভিযোগ সামনে আসায় তৃণমূলের আরও একটি বিড়ম্বনা তৈরি হল।

