উত্তরবঙ্গ সংবাদ ডিজিটাল ডেস্ক: বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে গেল। দীর্ঘ লড়াই, নাটকীয় দলবদল এবং একের পর এক নির্বাচনী বৈতরণী পার করে অবশেষে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসতে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন যে, বাংলায় বিজেপির প্রথম সরকারের নেতৃত্ব দেবেন বাংলার এই ভূমিপুত্রই। একসময়ের তৃণমূলের ‘ক্রাউড পুলার’ থেকে আজ তিনি রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান— শুভেন্দুর এই উত্তরণ ভারতীয় সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।
ছাত্র রাজনীতি থেকে জননেতা: মেদিনীপুরের তেজ
শুভেন্দু অধিকারীর রাজনীতির হাতেখড়ি কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদের মাধ্যমে। মেদিনীপুরের প্রভাবশালী অধিকারী পরিবারের সন্তান হিসেবে রাজনীতি তাঁর রক্তে। ২০০০ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন দলের সংগঠনের মূল স্তম্ভ। ২০০৬ সালে কাঁথি দক্ষিণ থেকে বিধায়ক হওয়া ছিল তাঁর সংসদীয় রাজনীতির শুরু। এরপর তমলুক থেকে জিতে সাংসদ হন। কিন্তু শুভেন্দুকে প্রকৃত অর্থে ‘জননেতা’র তকমা দেয় ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন। বাম আমলের দাপুটে নেতা লক্ষণ শেঠের সাম্রাজ্য ধূলিসাৎ করে মমতার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন এই শুভেন্দুই।
সাফল্য ও সংঘাতের সমীকরণ
২০০৯ সালে লক্ষণ শেঠ কে হারিয়ে তমলুক থেকে সাংসদ হন তিনি। ২০১৪ সালেও সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০১৬ সালে সাংসদ পদ থেকে পদত্যাগ করে নন্দীগ্রাম থেকে জিতে পরিবহণ মন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শুভেন্দু। জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে মালদহ-মুর্শিদাবাদ— যেখানেই তৃণমূল দুর্বল ছিল, সেখানেই সেনাপতির মতো লড়াই করে ঘাসফুল ফুটিয়েছেন তিনি। তবে ২০১৯ সালের পর থেকেই সমীকরণ বদলাতে থাকে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান এবং দলের অন্দরে গুরুত্ব কমতে থাকায় শুরু হয় বিদ্রোহ। ২০২০ সালে মন্ত্রিত্ব ও দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া ছিল বাংলার রাজনীতির মোড় ঘোরানো মুহূর্ত।
নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর: অপরাজেয় জয়যাত্রা
২০২১ সালের নির্বাচনে যখন গোটা বাংলা তৃণমূলের ঢেউয়ে ভাসছে, তখন নিজের গড় নন্দীগ্রামে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে ‘জায়ান্ট কিলার’ উপাধি পান শুভেন্দু। কিন্তু তাঁর চূড়ান্ত পরীক্ষা ছিল ২০২৬। এ বছর তিনি কেবল নিজের জয় নিশ্চিত করেননি, বরং তৃণমূলের সবথেকে সুরক্ষিত দুর্গ হিসেবে পরিচিত ভবানীপুর কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫,০০০ ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শ্রেষ্ঠ জয় ছিনিয়ে নিলেন। এই জয়ই তাঁর জন্য নবান্নের দরজা পাকাপাকিভাবে খুলে দিল।
নয়া সরকারের অগ্রাধিকার ও চ্যালেঞ্জ
মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দুর সামনে এখন বিশাল দায়িত্ব। একদিকে রাজ্যের ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মেরামত করা এবং অন্যদিকে শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি— এই দুই চ্যালেঞ্জই হবে তাঁর অ্যাসিড টেস্ট। মেদিনীপুরের যে ভূমিপুত্র একসময় তৃণমূলের ভিত গড়েছিলেন, আজ তিনিই সেই শাসনকাল সমাপ্ত করে নতুন ভোরের ডাক দিলেন।
