জলপাইগুড়ি: শারদোৎসবের ঠিক আগে ডুয়ার্সের পর্যটন মানচিত্রে যুক্ত হতে চলেছে এক নতুন ও ঐতিহাসিক অধ্যায়। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি ‘আনন্দমঠ’-এর কালজয়ী চরিত্র দেবী চৌধুরানী ও ভবানী পাঠকের স্মৃতিবিজড়িত জলপাইগুড়ির ঐতিহাসিক দেবী চৌধুরানী শ্মশান কালী মন্দিরকে কেন্দ্র করে এবার ধর্মীয় পর্যটন সার্কিট (Spiritual Tourism Circuit) গড়ে তোলার বড় উদ্যোগ নিল রাজ্য সরকার। পর্যটন দপ্তর থেকেও এই প্রকল্পে সবুজ সংকেত মিলেছে। বুধবার মন্দির কমিটির সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন রাজগঞ্জের বিধায়ক দিনেশ সরকার।
জলপাইগুড়ির গোশালা মোড়ে চার লেনের ২৭ নম্বর জাতীয় মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত এই শ্মশান কালী মন্দির। কৌশিকী অমাবস্যা ও কালীপুজোর রাতে এখানে হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে। ঐতিহাসিক ও গবেষকদের একাংশের মতে, তিস্তা নদীর ধারঘেঁষে দেবী চৌধুরানীর যে কটি গোপন আস্তানা ছিল, এটি তার মধ্যে অন্যতম। আজও এই মন্দির চত্বরে কুয়োর মধ্যে থাকা লুকনো সুড়ঙ্গ, প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন রুদ্রাক্ষ গাছ এবং রুকরুকা নদীতে বজরা নোঙর করার লোহার শেকলের মতো ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলি তার নীরব সাক্ষী হয়ে রয়েছে।
বহুদিন ধরেই এই মন্দিরটিকে ‘হেরিটেজ’ ঘোষণা করার দাবি উঠলেও নানা কারণে তা রূপায়িত হয়নি। সঠিক প্রচারের অভাব, রক্ষণাবেক্ষণের সংকট এবং মন্দির চত্বরের কিছু জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার ফলে এই ঐতিহাসিক স্থানটি এতদিন সেভাবে আলোর মুখ দেখেনি। মন্দিরের নিজস্ব আয়ের উৎস বলতে কেবল ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের অনুদান।
রাজগঞ্জ বিধানসভার অন্তর্গত এই মন্দিরটির সার্বিক উন্নয়ন ও পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বুধবার রাজগঞ্জের বিধায়ক দীনেশ সরকার মন্দির কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করার পাশাপাশি পুরো চত্বরটি ঘুরে দেখেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুধু দেবী চৌধুরানী মন্দিরই নয়, এর পাশাপাশি বোদাগঞ্জের ৫১ পিঠ ত্রিস্রোতা ভ্রমরী দেবী মন্দির, শিকারপুরের ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী স্মৃতিবিজড়িত সন্ন্যাসী ঠাকুরের মন্দির, রাজগঞ্জের ভদ্রেশ্বর শিব মন্দির এবং ফাটাপুকুরের হনুমান মন্দিরকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি সুসংহত ‘ধর্মীয় পর্যটন সার্কিট’ গড়ে তোলা হবে।
এই সার্কিট তৈরির আগে গোশালা মোড়ের শ্মশানকালী মন্দিরের পরিকাঠামোগত সংস্কার করা হবে। মন্দির চত্বর প্রাচীর দিয়ে ঘেরা, ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির রক্ষণাবেক্ষণ এবং দেবী চৌধুরানীর বজরা চলাচলের ঐতিহাসিক রুকরুকা নদী সংস্কার করে সেখানে পর্যটকদের জন্য নৌকাবিহারের ব্যবস্থা করারও পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যটন মন্ত্রী শংকর ঘোষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে এই পর্যটন সার্কিট গড়ার বিষয়ে ইতিমধ্যে সবুজ সংকেত মিলেছে বলে জানিয়েছেন বিধায়ক। সরকারের এই পদক্ষেপে যারপরনাই আনন্দিত মন্দির কমিটি। কমিটির সম্পাদক দেবাশীষ সরকার জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু মন্দিরেরই উন্নয়ন হবে না, বরং এই অঞ্চলের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিরও অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটবে।

