শিবশংকর সূত্রধর এবং বিশ্বজিৎ সাহা, শীতলকুচি: কোচবিহারের রাজনীতিতে যাঁর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় অথচ যিনি কোনওদিনই সক্রিয় রাজনীতির অংশ ছিলেন না তিনি মনীষী ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা। তৃণমূল কংগ্রেস হোক বা বিজেপি, সিপিএম হোক বা অন্য কেউ, ক্ষমতার রাজনীতিতে পা রাখার আগে প্রত্যেককেই যেন পঞ্চাননের দরবারে মাথা নোয়াতেই হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভরা সভামঞ্চে পঞ্চানন বর্মার মূর্তি স্পর্শ করে ‘বাংলাকে বাঁচানোর’ শপথ নেন। আবার বিজেপির তারকা প্রচারক মিঠুন চক্রবর্তী সভার আগে মালা পরিয়ে আসেন সেই একই মূর্তিতে। কোচবিহারের আবেগ যে পঞ্চাননকেন্দ্রিক, রাজনীতির কারিগরেরা তা ভালো করেই জানেন। কিন্তু আবেগ জানলেই কি দায়িত্ব শেষ হয়? শীতলকুচিতে (Sitalkuchi) পঞ্চানন বর্মার জন্মভিটের সামনে দাঁড়ালে সে প্রশ্নই সবচেয়ে জোরালো হয়ে ওঠে। শ্রদ্ধার ফুল যত, কাজের চিহ্ন ততটাই অপ্রতুল।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরির জন্য তাঁর জন্মভিটে খলিসামারিতে তড়িঘড়ি শিলান্যাস হয়েছিল। আশা জেগেছিল এবার অন্তত জন্মভূমি পাবে প্রাপ্য সম্মান। কিন্তু পাঁচ বছর পেরিয়ে শিলান্যাসের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে মাত্র দুটি ঘর। সেখানে আজও শুরু হয়নি পাঠদান। তৃণমূল কংগ্রেসের জেলা চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন নিজেকে পঞ্চানন অনুরাগী বলেই পরিচয় দেন। রাজ্য সরকারের এই গড়িমসি নিয়ে তাঁর অবস্থান কী সে প্রশ্ন স্থানীয়দের মনে বারবার উঁকি দেয়। অবশ্য গিরীন্দ্রনাথদের উদ্যোগে একটি ট্রাস্ট গড়ে পাশের জমিতে পড়াশোনার ঘর তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, যেখানে রাজ্য সরকার বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের শিলান্যাস করেছে, সেখানে আলাদা করে ট্রাস্টের প্রয়োজন কেন? তবে কি সরকারের ওপর আস্থার অভাবই এই সমান্তরাল উদ্যোগের কারণ? আজও সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
পঞ্চাননের জন্মভিটে আপাতত থাক। গত পাঁচ বছরে শীতলকুচি বিধানসভা এলাকায় কী উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে তার হিসেব করতে গেলে তালিকা ছোটই থেকে যায়। কিছু রাস্তা সংস্কার, পানীয় জলের প্রকল্প, ছোটখাটো কাজ ছাড়া বড় কোনও পরিবর্তনের ছাপ চোখে পড়ে না। অথচ চাহিদার শেষ নেই। শীতলকুচি ব্লকে নেই কোনও হিমঘর। গার্লস স্কুলের দাবি বছরের পর বছর ঘুরপাক খাচ্ছে। মাথাভাঙ্গা-১ ব্লকের জোরপাটকিতে ধরলা নদীর হাসানের ঘাটে সেতু তৈরির দাবি বহু দশকের পুরোনো হলেও আজও তা বাস্তবের মুখ দেখেনি। নদী দিয়ে বিচ্ছিন্ন শিবপুর, নগর গোপালগঞ্জের বাসিন্দারা যেন উন্নয়নের মানচিত্রে আজও প্রান্তিক। মাথাভাঙ্গার পঞ্চানন মোড় থেকে শীতলকুচি পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার রাস্তা সংস্কার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু চওড়া না হওয়ায় সেই ব্যস্ত সড়ক আজ দুর্ঘটনার ফাঁদ। নিত্যদিনের ঝুঁকি নিয়েই চলতে হয় সাধারণ মানুষকে।
এই বিধানসভা কেন্দ্র বর্তমানে বিজেপির দখলে। বিধায়ক বরেন বর্মনকে নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা যে পূরণ হয়নি, তা আড়ালে-আবডালে নয়, প্রকাশ্যেই শোনা যায়। এলাকায় বিজেপির প্রভাব থাকা সত্ত্বেও সেই রাজনৈতিক মূলধন কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। বিধায়ককে যেভাবে মানুষের পাশে পাওয়ার কথা, সেই উপস্থিতিও নাকি অধরা। শীতলকুচি ব্লকের আটটি এবং মাথাভাঙ্গা-১ ব্লকের সাতটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে গঠিত এই বিধানসভা কেন্দ্র বিজেপির কাছে যেমন পরীক্ষার মাঠ, তেমনি তৃণমূলের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এলাকায় কান পাতলে ধর্মীয় বিভাজনের সুর স্পষ্ট। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় সেই মেরুকরণই বিজেপির বাড়তি অক্সিজেন।
গত বিধানসভা নির্বাচনে এই আসনে তৎকালীন বিধায়ক হিতেন বর্মনকে সরিয়ে পার্থপ্রতিম রায়কে প্রার্থী করেছিল তৃণমূল। সেই সিদ্ধান্তে ধাক্কা দেয় পার্থর পরাজয়। সেই সময় রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন হিতেনবাবু, যদিও পরে তিনি মূলস্রোতে ফেরেন। তবে তৃণমূলের নীচুতলার নেতারাই বলছেন, পার্থপ্রতিমের যেভাবে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার কথা ছিল তা তিনি করেননি। শাসকদলের শীতলকুচি ব্লক সভাপতি তপন গুহ এখন নতুন করে সংগঠন গোছাতে শুরু করলেও সব পক্ষকে একত্রিত করতে পারেননি। এখানেও তৃণমূলের দুর্বলতা তাদের অন্তর্দ্বন্দ্ব। পার্থপ্রতিমের অনুগামীদের সঙ্গে বর্তমান জেলা নেতৃত্বের মতপার্থক্য স্পষ্ট, যার ফলে গোষ্ঠীকোন্দলের চোরাস্রোত বইছেই।
শীতলকুচির রাজনীতির স্মৃতিতে আজও রক্তের দাগ শুকোয়নি। জোরপাটকি আমতলি এমএসকে-তে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে চারজনের মৃত্যু এবং সেদিনই পাঠানটুলিতে বিজেপি কর্মী আনন্দ বর্মনের খুন- এই ঘটনাগুলি আজও এলাকার মানুষের মননে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে। সময় রক্ত শুকিয়ে দিলেও ক্ষোভ এখনও তাজা। তৃণমূল-বিজেপি দু’পক্ষই যে তাদের প্রচারে এই স্মৃতিকে অস্ত্র করবে, তা বলাই বাহুল্য। বিজেপি হিন্দু আবেগে শান দিতে চাইছে, তৃণমূল তুলে ধরছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলির প্রসঙ্গ।
এই মাটিরই সন্তান, ভাওয়াইয়াশিল্পী গীতা রায় বর্মন পেয়েছেন পদ্মশ্রী। বিজেপির অন্দরে নির্বাচনের আগে প্রার্থী হিসাবে তাঁর নাম ঘুরপাক খাচ্ছে। এদিকে, মাঠে কাজ করা কয়েকজন মহিলার কথায় ধরা পড়েছে ভোটের আরেক বাস্তবতা, ‘ভোট নিয়ে ভেবে লাভ নেই। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাই, তাতেই যথেষ্ট।’ তবে কী শীতলকুচিতে তৃণমূলের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পুঁজি এখন লক্ষ্মীর ভাণ্ডারই? নাকি আবেগ, স্মৃতি আর মেরুকরণের অঙ্কে বদলে যাবে সব সমীকরণ? সেই উত্তর মিলবে ভোটবাক্সেই।
