রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি: মিরিক থেকে সুখিয়াপোখরি পর্যন্ত ভারত-নেপাল সীমান্ত লাগোয়া ভারতীয় গ্রামগুলিতে প্রচুর মানুষ বাস করেন যাঁরা বাস্তবে নেপালের নাগরিক। দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এখানে বিনা নথিপত্রেই বসবাস করছেন। বেশিরভাগ পরিবারের কর্তা সহ একাধিক সদস্য কর্মসূত্রে সৌদি আরব, দুবাই সহ অন্যান্য দেশে থাকেন। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা এখানে বসবাস করেন। আবার এমনও অনেকে রয়েছেন যাঁরা, গত পাঁচ-দশ বছর আগে এপারে এসে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড বানিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু ২০০২ সালে তাঁরা বা তাঁদের পরিবারের কেউই এদেশের বাসিন্দা ছিলেন না।
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) (SIR) ঘোষণা হতেই ঘুম উড়েছে এই পরিবারগুলির। ঠিক যেন সমতলের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ছবি এখন পাহাড়ের নেপাল সীমান্তের গ্রামগুলিতে। এসআইআর হলে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে না তো? তাঁদের আটক করে শিবিরে নিয়ে রাখা হবে না তো, এসব প্রশ্ন ঘুরছে বাসিন্দাদের মনে। তাঁরা দলে দলে প্রশাসনিক আধিকারিক থেকে জনপ্রতিনিধিদের কাছে ছুটছেন। জিটিএ-র মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক শক্তিপ্রসাদ শর্মা বলেছেন, ‘অনেকেই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। জনপ্রতিনিধি থেকে প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাছে গিয়ে দরবার করছেন। তবে এটা তো পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের বিষয়। তথ্যপ্রমাণ দেখাতে না পারলে অনেকেরই নাম বাদ যেতে পারে। আবার কারও নাম যদি ভারতের ভোটার তালিকায় না থাকে তাহলে তিনি কর্মসূত্রে এখানে থাকতেই পারেন।’ দার্জিলিং সদরের মহকুমা শাসক রিচার্ড লেপচার বক্তব্য, ‘মূলত ২০০২ এবং ২০২৫ এই দুটি ভোটার তালিকা নিয়েই এসআইআর প্রক্রিয়ায় কাজ হবে। দুশ্চিন্তার কোনও কারণ নেই। নিয়ম মেনে নথিপত্র দেখাতে হবে।’
লোহাগড় থেকে শুরু করে মিরিক, সীমানা, পশুপতি, সুখিয়াপোখরি, মানেভঞ্জনের পুরো এলাকাই নেপাল সীমান্ত লাগোয়া। এখানকার চা বাগান থেকে শুরু করে হোটেল, রেস্তোরাঁয় নেপালের প্রচুর মানুষ কাজ করেন। অনেকেই বহু বছর এখানে কাজ করার সূত্রে ভারতের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ডও বানিয়ে নিয়েছেন। এমনও অনেক পরিবার রয়েছেন যাঁদের বাবা-মা হয়তো নেপালে থাকেন, কিন্তু ছেলেমেয়েরা এপারে এসে বসবাস করছেন। কিন্তু ২০০২ সালে তাঁরা বা তাঁদের পরিবারের কেউই এদেশের ভোটার ছিলেন না। তাঁদের কাছে নাগরিকত্বের ২০০২ সালের বা তার আগে এদেশে থাকার কোনও বৈধ নথিও নেই। ফলে তাঁরা এসআইআর নিয়ে আতঙ্কে রয়েছেন।
জিটিএ’র এক সদস্যের কথায়, বৃহস্পতিবার সকালে সীমানা এলাকার এক মহিলা আমার কাছে এসে বলছেন যে, ‘স্বামীর ভোটার কার্ড রয়েছে। তিনি দুবাইতে থাকেন। তাঁরও ৮-১০ বছর আগে ভোটার তালিকায় নাম উঠেছে। আমি এক সন্তানকে নিয়ে এখানে বসবাস করি। আমাদের পুরো পরিবার তো নেপালে থাকেন। এদেশের কোনও নথিপত্র হাতে নেই। আমাদের কি এদেশ থেকে তাড়িয়ে দেবে? আপনারা কিছু একটা করুন। যদি আটক করে শিবিরে নিয়ে যায়, তাহলে কী হবে? কিন্তু আমাদের যে কিছু করার নেই সেটা জানিয়ে দিয়েছি।’
মিরিক, পশুপতি, সুখিয়াপোখরির চা বাগানগুলিতেও প্রচুর শ্রমিক রয়েছেন যাঁদের বাবা-কাকারা নেপালের বাসিন্দা। ফলে তাঁরাও এসআইআর নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। সৌরিণী এলাকার জিটিএ সভাসদ অরুণ সিংজির বক্তব্য, ‘আমি ২০০২ এবং বর্তমান ভোটার তালিকা খতিয়ে দেখেছি। আমার এলাকায় এমন ঘটনা খুব বেশি নেই। কিছু মহিলা রয়েছেন যাঁরা বিবাহ সূত্রে এদেশে এসেছেন। তাঁদের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে।’
