শমিদীপ দত্ত ও রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি: বাড়ির মূল দরজায় ঝুলে রয়েছে তালা। দীপাবলির আলোর মালা এখনও সরানো হয়নি দরজার একপাশে থাকা দোতলা ঘর থেকে। সন্ধ্যার পর বাড়ির সামনেটা অন্ধকার হয়ে গেলেও সেই বাড়ি নিয়েই রবিবার শিলিগুড়ির আবেগ। বলা ভালো, বাড়ির মেয়েটাকে নিয়ে। মহিলা বিশ্বকাপের ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে হরমনপ্রীত কাউরের নেতৃত্বে খেলতে নামবেন শিলিগুড়ির (Siliguri) মেয়ে রিচা ঘোষ (Richa Ghosh)। গ্লাভস হাতে উইকেট রক্ষকের ভূমিকায় থাকবেন তিনি।
গোটা দেশ যখন প্রথমবার মহিলা বিশ্বকাপ জেতার আশায়, শিলিগুড়ি শহর তখন আরও একধাপ এগিয়ে রিচার চোখধাঁধানো পারফরমেন্সের অপেক্ষায়। রিচার প্রতিবেশী চিকিৎসক ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিত দাসরা আবেগে আপ্লুত। তাঁরা বলছেন, রিচা এখন শুধু আমাদেরই নয়, গোটা ভারতের গর্ব। গোটা ভারতের মেয়ে ও।’
পাড়ার মেয়ের খেলা দেখতে রিচার বাড়ি থেকে কয়েক পা দূরেই হাতি মোড়ে প্রোজেক্টর লাগানোর পরিকল্পনাও করে ফেলেছে ওয়ার্ড কমিটি। আকাশ পরিষ্কার থাকলে প্রতিবেশীদের অনেকেই সেখানে গলা ফাটাবেন। আবেগ, উন্মাদনার এই আঁচ বাড়াচ্ছে শিলিগুড়ি পুরনিগমও। মেয়র গৌতম দেব এদিন সাংবাদিক বৈঠক করে জানিয়েছেন, ‘পুরনিগমের তরফে রবিবার বাঘা যতীন পার্কে খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’ রিচাকে ঘিরে তিনিও আবেগতাড়িত, ‘পুরনিগমের থেকে ৩০০-৪০০ মিটার দূরেই রিচার বাড়ি। অসাধারণ পারফর্ম করছে। রবিবারের ফাইনালেও রিচার পারফরমেন্স দেখার জন্য অপেক্ষায় রয়েছি।’
ছোট থেকেই রিচাকে বড় হতে দেখেছেন সুভাষপল্লির চিকিৎসক ইন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলছিলেন, ‘পাড়ার একটা মেয়ে এমন স্তরে গিয়েছে, এর থেকে বড় পাওনা আর কী রয়েছে? ওর সঙ্গে সরাসরি কোনওদিন কথা হয়নি। তবে সবসময়ই ওকে দেখেছি বাবার সঙ্গে প্র্যাকটিস করতে যেতে।’
রিচার এই জায়গায় আসার পিছনে সূত্রধরের কাজটা নীরবে করে গিয়েছেন তাঁর বাবা মানবেন্দ্র ঘোষ। রিচার কাকা সুবিমল ঘোষের কথায় উঠে এল সেই প্রসঙ্গ। সুবিমল বলছিলেন, ‘রিচার এই জায়গায় যাওয়ার পুরো কৃতিত্বটাই দাদার। আমরা তেমন কোনও সহযোগিতা করিনি। দাদা নিজেও একজন ক্রিকেটার। ওর সঙ্গেই রিচা রোজ মাঠে খেলা দেখতে যেত, খেলত। বাবার মতোই ক্রিকেটে ছোট থেকেই ওর একটা অগাধ ভালোবাসা।’
রিচাকে ছোট থেকে দেখে এসেছেন ওয়ার্ড কাউন্সিলার মৌসুমি হাজরা। একাধিকবার রিচাকে নিয়ে তাঁর বাবা মানবেন্দ্র ঘোষ মৌসুমির অফিসেও গিয়েছেন। মৌসুমির কথায়, ‘খেলতে যাওয়াকে কেন্দ্র করে রিচা বাবার সঙ্গে কাউন্সিলার অফিসে এসে বিভিন্ন সার্টিফিকেট নিয়ে যেত। সত্যি কথা বলতে, সেই দিনগুলো ভাবলে নিজেকে এখন গর্বিত মনে হয়।’
রিচার সঙ্গে যে মানবেন্দ্রকে নিয়ে এত চর্চা, রবিবার মাঠে বসে তিনি মেয়ে আর তাঁর সতীর্থ ১০ জনের সমর্থনে গলা ফাটাবেন। আবেগতাড়িত হয়ে মানবেন্দ্র বলছিলেন, ‘সকলে আশীর্বাদ করুন। তাছাড়া আমার মেয়ে এখন সবার বাড়ির মেয়ে।’
সত্যিই রবিবার গোটা শহরের বাড়ির মেয়ে রিচা। এই আবেগের জন্যই শহরের অদূরে একটি শপিং মলের পাব ফাইনালকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। ওই পাবের ম্যানেজার এডওয়ার্স রোজারিওর কথায়, ‘রিচার ছবিতে আমরা গোটা পাব সাজাব। সেই সঙ্গে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট টিমের অন্য সদস্যদেরও ছবি থাকবে। খাওয়াদাওয়াতেও আমরা বিশেষ অফারের ব্যবস্থা করছি।’ একই সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছিলেন সেবক রোডের একটি রেস্তোরাঁর ম্যানেজার মায়াঙ্ক রাথি। তিনি বলছিলেন, ‘গোটা রেস্তোরাঁ সাজানো হবে তেরঙা বেলুনে। ভারতীয় মহিলা টিমের ছবি থাকবে। খেলা দেখানোর ব্যবস্থাও থাকছে।’
টিম ইন্ডিয়া ট্যাগলাইনটা এখন শুধু রো-কো বা গিলদের সম্পত্তি নয়। মেন ইন ব্লুজ-এর মতোই তারকা হয়ে গিয়েছেন উওমেন ইন ব্লুজ।
