নাগরাকাটা: সিকিমে টানেল দুর্ঘটনায় (Sikkim Tunnel Accident) উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের মেটেলি ও নাগরাকাটা ব্লকের বিভিন্ন চা বাগান এবং গ্রামীণ এলাকায় নেমে এল গভীর শোকের ছায়া। মেটেলির কিলকোট চা বাগান থেকে কাজের সুবাদে সিকিমে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে অন্তত ১ জনের নিশ্চিত মৃত্যুর খবর মিলেছে। সব মিলিয়ে কিলকোট, নাগেশ্বরী, ইনডং, মেটেলি, গ্রাসমোড় চা বাগান এবং খয়েরবাড়ি, সুখানীবস্তীর মতো এলাকা থেকে মোট ৫ জন শ্রমিক কাজ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বাকিদের কোনো নিশ্চিত খবর মেলেনি। মৃত বা নিখোঁজ এই শ্রমিকদের সিংহভাগই দুস্থ আদিবাসী পরিবারের এবং কারোরই বয়স ৪০ বছরের বেশি নয়। পাকা খবরের অপেক্ষায় আশঙ্কার প্রহর গুনছেন নিখোঁজ পরিবারগুলির সদস্যরা। মঙ্গলবার পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় পরিবারের লোকজন সিকিমের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।
কিলকোট চা বাগানে কান্নার রোল: কিলকোট চা বাগানের ১১ নম্বর শ্রমিক মহল্লার বাসিন্দা বছর ৩৮-এর বিকেশ্বর ওরাওঁ চা বাগানের অনিশ্চয়তা কাটিয়ে বাড়তি আয়ের আশায় মাস দুয়েক আগে সিকিমে গিয়েছিলেন। পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন থাকলেও এখন সেখানে শুধু কান্নার রোল। বিকেশ্বরের স্ত্রী দেবিকা শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, খবর পেয়ে বাড়ি ফিরে জানতে পারেন তাঁর স্বামী আর নেই। তিন সন্তানকে নিয়ে তিনি এখন অথৈ জলে পড়েছেন।
একই লাইনের শিবা লোহারের বাড়িতেও একই পরিস্থিতি। দিন চারেক আগে সিকিমে কাজে যাওয়া শিবা সম্পর্কে স্ত্রী মণিকা মুন্ডা জানান, প্রশাসনিক আধিকারিকরা বাড়িতে এসে তাঁর স্বামীর কিছু হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বছর দুয়েক আগে বিয়ে হওয়া মণিকার এখনও কোনও সন্তান নেই। এই এলাকায় ৩০ বছর বয়সি গ্র্যাব্রিয়েল টিগ্গারও এখনও কোনো খোঁজ মেলেনি। স্থানীয় বাসিন্দা সুমি ওরাওঁ আক্ষেপ করে বলেন, “বাগানে কাজ নেই, তাই পেটের টানে এলাকার যুবকরা দলে দলে বাইরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এখানে কাজ করলেও নিয়মিত মজুরি মেলে না।”
ইনডং ও সোমাপাড়ার মর্মান্তিক চিত্র: এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে মৃতদের তালিকায় রয়েছে ইনডং চা বাগানের ৩১ বছরের তরুণ শ্যাম ওরাওঁ-এর নাম। নাগরাকাটার গ্রাসমোড় চা বাগানের এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর বিয়েও ঠিক হয়েছিল। মেটেলি চা বাগানের বিন্দ্রা লাইনের ২০ বছরের তরুণ আদেশ ওরাওঁ-এর স্ত্রী ঋতিকা কাছুয়া থানা থেকে খবর পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অন্যদিকে, নাগরাকাটার সোমাপাড়ার বোলো ওরাওঁ-এর মৃত্যুর খবর পৌঁছতেই বাড়িতে হাজারো মানুষের ভিড় জমে। বোলোর স্ত্রী সরস্বতীকে কেউ মর্মান্তিক এই খবরটি দিতে পারেননি, আর বৃদ্ধ বাবা টিলু ও মা সুমরি বিকেল পর্যন্তও পরিস্থিতির কিছুই জানতেন না। প্রতিবেশী ভরত ভগত জানান, চরম অভাবের সংসারে বোলোর অন্য ভাইয়েরাও ভিন রাজ্যে কাজ করেন। ছয় বছরের সন্তানকে নিয়ে বোলোর স্ত্রী এখন চরম বিপাকে।
নিখোঁজ আরও অনেকে: নাগরাকাটার সুখানীবস্তীর মোহনমোহনধুড়ার অর্জুন সাঁওতাল (৩২) এবং গ্রাসমোড় চা বাগানের ২ নম্বর লাইনের আনন্দ টোপনো (৩৬)-রও কোনো খোঁজ মিলছে না। মাত্র দু’সপ্তাহ আগে সিকিমে যাওয়া আনন্দের মা অরুণা দেবীর একটাই কথা, ছোট ছেলেকে পাঠিয়ে এখন তিনি দিশাহারা, আর বড় ছেলেও কাজের সূত্রে কেরালায় রয়েছে।
দুর্ঘটনাগ্রস্ত এই শ্রমিকরা সকলেই আলিপুরদুয়ার লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ মনোজ টিগার সংসদীয় এলাকার বাসিন্দা। সাংসদ এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করে জানিয়েছেন যে, শোকস্তব্ধ এই পরিবারগুলির পাশে তাঁরা সর্বতোভাবে রয়েছেন।

