উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্কঃ প্রবল ছাত্র আন্দোলনের জেরে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়ার ঠিক দু’বছর পর, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের ঠিক বার্ষিকীতে জনসমক্ষে প্রথমবার মুখ খুললেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina digital speech Delhi)। বুধবার ৫ অগাস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে দৃপ্তকণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেন, ‘‘আমি মুজিব কন্যা বলছি…। ওরা আমাকে জেলে ভরতে পারে, মিথ্যে মামলায় ফাঁসাতে পারে। কিন্তু আমি বাংলাদেশে ফিরবই, সে দেশের মানুষের জন্য ফিরব। দেশকে আবার সঠিক পথে আনার জন্য আমাকে ফিরতেই হবে।’’
দু’বছর আগের সেই ‘অভিশপ্ত’ দিনের স্মৃতিচারণ করে হাসিনা দাবি করেন, সেদিন কোনো শান্তিপূর্ণ আন্দোলন হয়নি, বরং তা ছিল ক্ষমতা দখলের এক সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তাঁর বক্তব্য, ১৫ জুলাইয়ের পর থেকেই ওই আন্দোলনের চরিত্র পুরোপুরি বদলে যায় এবং দেশের সরকারি সম্পত্তি পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়। ছাত্রছাত্রীদের কোটা আন্দোলনের সূত্র ধরে তিনি বলেন, ‘‘শুরুতে আমরা সমস্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছিলাম। কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং আলোচনার জন্য ৩ জন মন্ত্রীকে পাঠানো হয়। কিন্তু তারা আমার পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকে এবং মিথ্যা অপপ্রচারের আশ্রয় নেয়।’’
১৯৮১ সালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলেও তাঁকে দেশে ফের বাধা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তিনি দমে যাননি। এবারও তাঁকে কারাগারে পাঠানো বা হত্যার হুমকি দেওয়া হলেও তিনি যে কোনো মূল্যে নিজের দেশে ফিরতে বদ্ধপরিকর।
হাসিনার অভিযোগ, তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর থেকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মারাত্মক বিপর্যয় ঘটেছে। গত কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবার শিল্প উৎপাদন সংকুচিত হয়েছে, ঋণখেলাপির হার ও দারিদ্র্য ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিনিয়োগ মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাঁর দাবি, বর্তমান প্রশাসন প্রতি মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে সরকারি কাজ চালাচ্ছে। বহু কারখানায় তালা ঝুলেছে এবং শত শত শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন।
পাশাপাশি, ছাত্র বিক্ষোভের সময়কার প্রতিটি মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য তাঁর সরকার ১৮ জুলাই যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা হতে দেয়নি বলে অভিযোগ করেন হাসিনা। তাঁর প্রশ্ন, ইউনূস সরকারের যদি কোনো ভয় না-ই থাকে, তবে কেন সত্যকে প্রকাশ্যে আসতে দেওয়া হলো না?
ইতিমধ্যেই একাধিক মামলায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় হাসিনার মাথার ওপর ঝুলছে ফাঁসির সাজা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রোসিকিউটর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি দেশে পা রাখা মাত্রই তাঁকে সোজা জেলে পাঠানো হবে। তবে হাসিনাও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আত্মসমর্পণেও রাজি, শুধু নিজের দেশবাসীর কাছে ফিরতে চান।
এদিনের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে হাসিনার পাশপাশি তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরি নওফেল এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক সাকিব-আল-হাসান-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সজীব ওয়াজেদ জয় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত হচ্ছে। পুলিশি হেপাজতে আওয়ামী নেতাকর্মীদের খুন করা হচ্ছে, সংবাদমাধ্যম আক্রান্ত এবং দেশ আজ দুষ্কৃতীদের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।’’ পাকিস্তান-ঘনিষ্ঠ মৌলবাদীদের বাড়বাড়ন্ত ও হিজবুল তাহরিরের মতো সংগঠনের সক্রিয়তার কথা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।

