আলিপুরদুয়ার: ভর্তির ১৮ বছর পর পরীক্ষা হচ্ছে। রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমনই বিরলতম ঘটনা ঘটতে চলছে সংস্কৃত টোলগুলোর ক্ষেত্রে।
রাজ্যে বাম আমলের আগে থেকেই চালু রয়েছে সংস্কৃত টোলগুলো (Sanskrit Tolls)। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে টোলগুলোতে পরীক্ষা হতে পারে। প্রাথমিক দিনক্ষণ ঘোষণা হলেও তা অবশ্য চূড়ান্ত নয়। আলিপুরদুয়ার শহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ডের পলাশবাড়িতে দ্বারিকানাথ চতুষ্পাঠী (সংস্কৃত কলেজ) ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই টোলে শেষ পরীক্ষা হয়েছিল ২০০৭ সালে। তারপর ৩২ জন নতুন করে ভর্তি হন। পঠনপাঠন চালু থাকলেও পরীক্ষা হয়নি। এখনও অবশ্য আলিপুরদুয়ারে ১৪ জন পরীক্ষায় বসার জন্য তৈরি রয়েছেন।
রাজ্যে বিজেপি সরকারে আসার পর প্রায় বন্ধ সংস্কৃত টোলগুলি প্রাণ ফিরে পেতে চলেছে। টোল খোলা নিয়ে সম্প্রতি কলকাতা সংস্কৃত কলেজে আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর মাস নাগাদ পরীক্ষা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাতেই আশায় বুক বাঁধছেন পরীক্ষার্থীরা। পুরোনো সিলেবাসে পরীক্ষার পর নতুন সিলেবাস চালু করা হবে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসের অনুকরণে নতুন সিলেবাস তৈরির প্রাথমিক পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
কলকাতা সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের টোল বিভাগের সম্পাদক পলাশ বিশ্বাস জানান, টোলগুলিকে ফের স্বমহিমায় ফেরানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করা হচ্ছে। একাধিক বিষয়ে সদর্থক আলোচনা হয়েছে। আশা করছি, শীঘ্রই টোলগুলি চালুর বিষয়ে জানানো হবে।’ এর বেশি তিনি কিছু বলতে চাননি।
তবে দক্ষিণেশ্বরের আদ্যাপীঠ বালক আশ্রমের প্রধান রাজেন মহারাজ বলেন, ‘পুরোনো সিলেবাসে পুরোনো পদ্ধতিতে ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষা হবে। তার প্রস্তুতি চলছে। তারপর থেকে কেন্দ্রীয় সংস্কৃত শিক্ষানীতি মেনে পঠনপাঠন চলবে। একসময় রােজ্য এক হাজারের উপরে টোল ছিল। এখন সেখানে তিনভাগের এক ভাগ টোলের অস্তিত্ব রয়েছে।’
টোলগুলিতে সাধারণত সংস্কৃতে বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, বিভিন্ন দর্শন শাস্ত্র, ন্যায় শাস্ত্র, সংস্কৃত ব্যাকরণ, পাণিনি ব্যাকরণ, সারস্বত, চন্দ্রিকা, কলাপ ব্যাকরণ, জ্যোতিষ শাস্ত্র এমনকি পৌরোহিত্য শেখানো হত। অদ্য (প্রথম বর্ষ), মধ্য (দ্বিতীয় বর্ষ) এবং তীর্থ (তৃতীয় বর্ষ)। তিন বছর পর পড়ুয়ারা সেই বিষয়ে ডিগ্রি অর্থাৎ ‘তীর্থ’ লাভ করেন। তাঁরা কাব্যতীর্থ, শাস্ত্রতীর্থ ইত্যাদি নামে সম্মানিত হন। একজন একাধিক বিষয়ে তীর্থ হতে পারেন। প্রতিটি বিষয়ে তীর্থ সম্মানের জন্য তিন বছর সময়সীমা।
দ্বারিকানাথ চতুষ্পাঠীর (সংস্কৃত কলেজ) অধ্যক্ষ নিত্যানন্দ নন্দী বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর টোলগুলিতে পরীক্ষা চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষা হতে পারে। তার প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। নতুন করে আরও টোল খোলা যায় কি না সে বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।’ মঙ্গল লাহিড়ী টোলের এক ছাত্র কর্মসূত্রে শিলিগুড়ি থাকেন। পরীক্ষা চালু হওয়ার খবরে খুশি হলেও কতটা সময় বের করে পরীক্ষায় বসতে পারবেন তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য বসে ছিলাম। তবে পরীক্ষা চালু হওয়ার খবরে খুশি। নিয়মিত পরীক্ষা হলে নতুন প্রজন্মের পড়ুয়াদের বিশেষ সুবিধা হবে।’
পরীক্ষা চালু করলে টোলগুলিতে পড়ুয়াদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছে টোল কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে দীর্ঘ বছর ধরে অনেকেই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি রয়েছেন। তবে পুরোনো সিলেবাসের আধুনিকীকরণ জরুরি। তাতে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়ার পর থেকেই টোলে পড়ার সুযোগ মিলবে। সেক্ষেত্রে টোলের ডিগ্রির পুরোনো নিয়মকানুন বদলাবে। রাজ্যের বেশিরভাগ টোল বন্ধ হয়ে গিয়েছে নয়তো বন্ধের মুখে। স্বাভাবিকভাবে পরিকাঠামোগত সমস্যার সঙ্গে শিক্ষকসংকট পরিস্থিতি ভাবাচ্ছে। শিক্ষক সমস্যা দূর করতে অবশ্য বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিিগ্রধারী শিক্ষিত তরুণদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে।
