শেখ পান্না, রতুয়া: রাতের চিৎকার আর নেই। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা পরেও চোখের কোণ ভেজা অধিকাংশেরই। সর্বত্রই শুধুই হাহাকার। স্ত্রীকে হারিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন আনন্দ মণ্ডল। বাকশক্তি কার্যত হারিয়ে ফেলেছেন। উপড়ে পড়া গাছের অধিকাংশই রাস্তা থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, কিন্তু ধংসস্তূপের ক্ষতচিহ্ন টাটকা রতুয়া (Ratua) ১ নম্বর ব্লকের মহানন্দটোলা, বিলাইমারি ও কাহালা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। শনির প্রলয় এভাবে তাঁদের পথে বসাবে, কোনও ধারণাই ছিল না কারও।
রাস্তার ধারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গাছের টুকরো। একাধিক বিদ্যুতের পোল বেঁকে গিয়েছে। পরিষেবা স্বাভাবিক করতে রবিবার থেকে কাজ শুরু করেছে রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন কোম্পানি। কিন্তু অধিকাংশ এলাকা এখনও বিদ্যুৎহীন। প্রশাসনিক হিসেব বলছে, শনিবার রাতের ঘূর্ণিঝড়ে (Cyclone) ক্ষতিগ্রস্ত ছয়শো পরিবার। সোমবার কাহালা গ্রাম পঞ্চায়েতের নরোত্তমপুর এলাকায় পা রেখে স্পষ্ট হল, ঝড়ের তীব্রতা। একের পর এক কাঁচা বাড়ি ভেঙে পড়েছে। সারি সারি বাড়ির টিনের চাল উড়ে গিয়েছে। এখানেই গাছের ডাল চাপা পড়ে মৃত্যু হয় সন্ধ্যা মণ্ডলের। স্ত্রী সন্ধ্যাকে হারিয়ে কথা হারিয়েছেন আনন্দ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে এখানে এদিন পৌঁছান রতুয়ার বিধায়ক তৃণমূলের সমর মুখোপাধ্যায়। তিনি আর্থিক সাহায্য করেন আনন্দকে, জানান সমবেদনা। গাছ এবং বাড়ি ভেঙে পড়ায় অনেকে জখম হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে একাধিক গবাদিপশুর। প্রশাসনিক ত্রাণ এবং সাহায্য নিয়ে জেলা শাসক সহ প্রশাসনের পদস্থ কর্তাদের সঙ্গে তিনি কথা বলবেন বলে জানান সমর। রবিবার কিছু পরিবারকে ত্রিপল দেওয়া হয়েছিল প্রশাসনের তরফে। সেই ত্রিপলের নীচে এদিন দেখা গিয়েছে অনেক পরিবারকে।
নাকাট্টি ব্রিজ সংলগ্ন বলরামপুর বাঁধ এলাকায় আশ্রয় নেওয়া ভাঙনদুর্গত পরিবারগুলির সঙ্গেও দেখা করেন প্রশাসনিক কর্তারা। ওই এলাকায় প্রায় শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারও বাড়ির চাল উড়ে গিয়েছে, কারও আবার সম্পূর্ণ ঘর ভেঙে পড়েছে। তবে অভিযোগ, বিলাইমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের রুহিমারি, রামায়ণপুর ও ছবিটোলার মতো একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামে এখনও প্রশাসনের কেউ পৌঁছায়নি। সোমবার রুহিমারি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের অধিকাংশ কাঁচা বাড়ির টিনের ছাউনি ঝড়ে উড়ে গিয়ে গাছের ডালে ঝুলছে অথবা মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। অনেক পরিবার খোলা আকাশের নীচে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। কেন তাঁদের পাশে প্রশাসন নেই, প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। আকমাল হোসেন বললেন, ‘শনিবার রাত থেকেই পরিবার নিয়ে খোলা আকাশের নীচে রয়েছি। এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের কেউ গ্রামে এসে খোঁজখবর নেয়নি। নতুন টিন কেনার সামর্থ্য নেই, ভাঙা টিন দিয়েই কোনওরকমে ঘর মেরামতের চেষ্টা করছি।’ সামনে কোরবানি ইদ। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে ইদ পালন করবেন, বুঝতে পারছেন না আকমালের মতো অনেকেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙনকবলিত এলাকাগুলিতে পর্যাপ্ত সরকারি সহযোগিতা মেলে না। ঘূর্ণিঝড়ের পরেও প্রশাসনের অনুপস্থিতিতে ক্ষোভ বাড়ছে গ্রামবাসীদের মধ্যে।
ঝড়ের ক্ষতচিহ্ন দেখিয়ে অনেকেই বললেন, শনিবার রাতে হালকা হাওয়া মুহূর্তে বিধ্বংসী ঝড়ে পরিণত হয়। মুহূর্তে লন্ডভন্ড হয়ে যায় সমস্তকিছু। ঝড় থামার পর তাঁরা দেখেন, চারদিকে শুধু গাছ উপড়ে পড়েছে, উড়ে আসা টিনের চাল এবং শুধুই অন্ধকার। একজন বললেন, ‘ঝড় শুরু হতেই বয়স্ক মা, স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ি। চারদিকে শুধু চিৎকার আর আতঙ্কের পরিবেশ ছিল। ঝড় থামার পর মনে হয়েছে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।’ কিন্তু স্বাভাবিক ছন্দে কবে ফিরবে রতুয়ার গ্রামগুলি, জানেন না গ্রামবাসীরা।
