অরিন্দম বাগ, মালদা: বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে অত্যন্ত কড়া নীতি গ্রহণ করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যজুড়ে অনুপ্রবেশকারীদের ধরে নিয়ে এসে প্রথমে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হচ্ছে এবং তারপর সেখান থেকে সরাসরি পুশব্যাক করার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। এই প্রশাসনিক তৎপরতার প্রেক্ষিতে উত্তরবঙ্গের অন্য জেলাগুলির মতোই মালদা জেলার বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকাতেও পরিস্থিতি এখন যথেষ্ট উত্তপ্ত ও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। আর এই টানটান উত্তেজনার আবহের মধ্যেই আগামী ১৪ জুন থেকে মহদিপুর সীমান্ত লাগোয়া ঐতিহাসিক এলাকায় শুরু হতে চলেছে ঐতিহ্যবাহী রামকেলিমেলা (Ramkeli Mela)। মেলা চলাকালীন সীমান্ত সুরক্ষায় যাতে কোনও রকম ফাঁক না থাকে, তার জন্য এবার আগেভাগেই কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। রামকেলিমেলা নিয়ে সীমান্ত লাগোয়া বিস্তীর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি চালানো হবে এবং এই বিষয়ে জেলা পুলিশের তরফে ইতিমধ্যেই সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বা বিএসএফ-এর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের প্রক্রিয়া শুরু করে দেওয়া হয়েছে।
মেলা উপলক্ষ্যে সোমবার মালদা জেলা প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স হলে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি লিপিকা বর্মন ঘোষ, মালদার জেলা শাসক রাজনবীর সিং কাপুর, পুলিশ সুপার অনুভব সিং, বিজেপি বিধায়ক অম্লান ভাদুড়ি, গোপাল সাহা, গৌরচন্দ্র মণ্ডল, রাজু কর্মকার এবং তৃণমূল বিধায়ক মতিবুর রহমান। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের উচ্চপদস্থ আধিকারিক সহ রামকেলিমেলা কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে অংশ নেন। অন্যান্য বছরের মতো এবারও রামকেলিমেলাতে দূরদূরান্ত থেকে আগত অগুনতি ভক্তের সুবিধার জন্য পানীয় জল, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, অস্থায়ী শৌচালয়, প্রাথমিক চিকিৎসা শিবির এবং সুশৃঙ্খল যাতায়াতের ব্যবস্থা সহ নানা প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করছে মালদা জেলা প্রশাসন।
আর সেইসঙ্গে জোর দেওয়া হয়েছে মেলা ও মেলায় আসা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টিতেও। সীমান্তে নজরদারি তো থাকবেই, সেইসঙ্গে মেলায় যে কোনও দুষ্কর্ম ঠেকাতে থাকবে পুলিশের কড়াকড়িও। প্রতি বছরই বৈষ্ণব ভক্তদের মহাসমাগমে ভিড় উপচে পড়ে বাংলার এই প্রাচীন রাজধানী গৌড়ে। কিন্তু ভিড়ের সুযোগ নিয়ে প্রতি বছরই মেলা প্রাঙ্গণ থেকে পকেটমারি ও চুরির মতো ভূরিভূরি অভিযোগ সামনে আসে। সাধারণ মানুষের সেই নিরাপত্তার সমস্যার কথা মাথায় রেখে এবার পুলিশ প্রশাসনের তরফে গৌড় ও মেলা চত্বরে একাধিক ওয়াচটাওয়ার তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সমস্ত পরিকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বিভিন্ন দপ্তরের আধিকারিকদের সঙ্গে নিয়ে মেলা এলাকা পরিদর্শনে যাচ্ছে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন।
জেলা পুলিশ সূত্রে খবর, গত বছরের মতো এবারও রামকেলিমেলা চত্বরে সর্বমোট ১০টি পুলিশ সহায়তাকেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। মেলার বিভিন্ন প্রান্তে তীক্ষ্ণ নজরদারি চালানোর জন্য প্রাথমিকভাবে ৫টি ওয়াচটাওয়ার তৈরি করার চিন্তাভাবনা করেছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। মঙ্গলবার এলাকা পরিদর্শনের সময় এই ওয়াচটাওয়ারগুলি ঠিক কোন কোন জায়গায় বসানো হবে, তা নির্ধারণ করার সম্ভাবনা রয়েছে। নিরাপত্তার সামগ্রিক প্রস্তুতি প্রসঙ্গে মালদার পুলিশ সুপার অনুভব সিং বলেন, ‘এদিন রামকেলিমেলা নিয়ে প্রশাসনিক বৈঠক করা হয়েছে। মেলায় আগত ভক্তদের নিরাপত্তায় আমরা একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করছি।’
এ ছাড়া মেলায় সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে, ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারিও চালানো হবে। মেলায় সাদা পোশাকের পুলিশও থাকবে। পুলিশ অ্যাসিস্ট্যান্ট বুথে একটু বেশি সংখ্যায় পুলিশ মোতায়েন করা হবে। এসপি বলেন, ‘প্রতি বছরই মেলাতে চুরি, পকেটমারির অভিযোগ ওঠে। সেদিকে নজর রেখে আমরা সাদা পোশাকের পুলিশের সংখ্যা বাড়াচ্ছি। পাশাপাশি ওই এলাকায় একাধিক ওয়াচটাওয়ার বসানো হবে। গত বছর রামকেলিমেলা নিয়ে পুলিশের কী কী ব্যবস্থা ছিল, কী কী ব্যবস্থার আরও প্রয়োজন রয়েছে সেসব আমরা খতিয়ে দেখে উপযুক্ত পদক্ষেপ করব।’
অন্যদিকে, চলতি মাসের একেবারে শুরুতেই মহদিপুর সীমান্ত এলাকায় এক বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে হাতেনাতে আটক করেছিল বিএসএফ। সেই ঘটনার কথা মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকার দিকে এবার বিশেষভাবে নজর দিচ্ছে মালদা জেলা পুলিশ। যেহেতু রামকেলিমেলা প্রাঙ্গণ থেকে মহদিপুর আন্তর্জাতিক সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার, তাই মেলা চলাকালীন জেলা পুলিশের তরফে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ-কে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে এবং টহলদারি বাড়াতে বলা হচ্ছে।
