রাহুল দেব, রায়গঞ্জ: মন্দির, মসজিদ গড়ার চেয়ে বিদ্যালয় ও হাসপাতাল তৈরি অনেক ভালো, কথাগুলি যখন বলছিলেন সোনামণি শেখ, তখন ‘পিন ড্রপ সাইলেন্স’ সভাকক্ষে। এখানে না থেমে উত্তরবঙ্গ বৃহন্নলা সমাজের বড়মা বললেন, ‘রায়গঞ্জে এইমস (Raiganj AIIMS) হাসপাতাল হলে, আমাদের যত জমি রয়েছে, সব বিক্রি করে সেই অর্থ প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন তহবিলে দান করব।’ রবিবার শহরের একটি সভায় সোনামণির রাখা এমন বক্তব্য ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নেয়নি। রায়গঞ্জ তো বটেই, তাঁর এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে হৃদয় ছুঁয়ে গিয়েছে উত্তর দিনাজপুর জেলার। যথারীতি তাঁকে এবং বৃহন্নলা সমাজকে ব্যবসায়িক থেকে রাজনৈতিক মহল— কুর্নিশ করছেন সর্বস্তরের মানুষ।
এইমস রায়গঞ্জ (Raiganj) তথা উত্তর দিনাজপুরের (Uttar Dinajpur) আবেগের সঙ্গে জড়িত। প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির উদ্যোগে রাজ্যে এইমসের জন্য জমি চিহ্নিত হয়েছিল উত্তর দিনাজপুরের পানিশালিতে। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রায়গঞ্জের ‘প্রাপ্য’ এইমস চলে যায় কল্যাণীতে। পরবর্তীতে মিছিল, মিটিং— কম হয়নি আন্দোলন। কিন্তু জমি বিক্রি করে অর্থদান, এমন ঘোষণা এই প্রথম। এদিন বৃহন্নলা সমাজের বড়মা সোনামণি বলেন, ‘আমাদের বৃহন্নলা সমাজের মেয়েদের নামে দুই কাঠা, পাঁচ কাঠা, দশ কাঠা করে মোট ৬০ কাঠা জায়গা কেনা রয়েছে। এ বিষয়ে সমাজের সকলের সঙ্গে আলোচনা করে বুঝতে পেরেছি, জমি বিক্রি করে টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে কারও কোনও আপত্তি নেই। মন্দির, মসজিদ গড়ার চেয়ে বিদ্যালয় ও হাসপাতাল তৈরি অনেক ভালো বলে আমি মনে করি। উত্তরবঙ্গে এইমস নির্মাণ হলে রায়গঞ্জই তার প্রধান ও প্রথম দাবিদার। তাই রায়গঞ্জে এইমস হলেই আমাদের জমি বিক্রি করে সেই টাকা প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন তহবিলে দান করব।’ রায়গঞ্জ শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডে থাকা ৬০ কাঠা জমির দাম যে কয়েক কোটি টাকা, তা নিয়ে সংশয় নেই কারও। প্রসঙ্গত, অসমের সাম্প্রতিক বন্যায় সোনামণি তাঁর সমাজের তরফে পঁচিশ লক্ষ টাকা দান করেছেন।
বৃহন্নলা সমাজের তরফে সোনামণি যে ঘোষণা করেছেন, তা সকলের মনে দাগ কেটেছে। পশ্চিম দিনাজপুর চেম্বার অফ কমার্সের সাধারণ সম্পাদক শংকর কুণ্ডু বলেন, ‘এইমসের স্বার্থে নিজেদের সম্পত্তি বিক্রি করবেন বলে এগিয়ে এসেছেন, এর থেকে বড় আর কিছু হতে পারে না। বরং এইমস হাসপাতাল হওয়ার ক্ষেত্রে রায়গঞ্জ একধাপ এগিয়ে থাকল। বৃহন্নলা সমাজ বড় মানসিকতার প্রমাণ দিল। রায়গঞ্জের এইমসের সঙ্গে কত মানুষের আবেগ, ভালোবাসা জড়িয়ে আছে, তার প্রমাণ মিলল আরও একবার।’ শহরের সুশীল সমাজ বৃহন্নলা সমাজের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছে মুক্তকণ্ঠে। পেশায় শিক্ষক শোভন মৈত্র বললেন, ‘এটি অত্যাশ্চর্য একটি ঘটনা। বর্তমান সময়ে সমাজের প্রায় সকলেই যখন ভোগবিলাসে ব্যস্ত, সেখানে বৃহন্নলা সমাজের এই মহান উদারতা বর্তমানের স্বার্থবাদী সমাজের বুকে যেন এক টুকরো চাবুকের আঘাতের সমান। বৃহন্নলা সমাজের এই ঘোষণা সত্যিই বিরল। তাঁদের কুর্নিশ জানাই।’ রায়গঞ্জের বিধায়ক বিজেপির কৌশিক চৌধুরীর কথায়, ‘মহৎ কাজ বা সামাজিক কাজ কোন জায়গা পর্যন্ত যেতে পারে, তার নিদর্শন তৈরি করল বৃহন্নলা সমাজ। তাঁরা যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সমাজ যাঁদের অচ্ছুত করে রাখে, তাঁরা সমাজের চোখ খুলে দিয়েছেন। রায়গঞ্জে এইমস নির্মাণ হলে ওঁরা যে টাকা দিতে চাইছেন, তা সাদরে গ্রহণ করা হবে।’

