উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: দেশের অটোমোবাইল সেক্টরের অন্যতম পরিচিত ওয়্যারিং হার্নেস (Wiring Harness) প্রস্তুতকারক সংস্থা ধূত ট্রান্সমিশন (Dhoot Transmission)-এর ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং বা আইপিও (IPO) আজ থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য খুলে গিয়েছে। দেশের টু-হুইলার এবং থ্রি-হুইলার বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা এই সংস্থাটি বাজারে তালিকাভুক্ত হতে চলেছে। তবে কোম্পানির আইপিও প্রাইস ব্যান্ডের সর্বোচ্চ মূল্য ৮৭১ টাকা ধার্য করা হয়েছে, যা তাদের গত বছরের আয়ের প্রায় ৪৫ গুণ। বাজারের এক নম্বর প্লেয়ার হওয়া সত্ত্বেও কোম্পানির কমতে থাকা মার্জিন এবং নেতিবাচক ফ্রি ক্যাশ ফ্লো নিয়ে এখন বিনিয়োগ মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।
একনজরে দেখে নেওয়া যাক ধূত ট্রান্সমিশনের ব্যবসার খুঁটিনাটি, সুযোগ এবং বিনিয়োগের ঝুঁকিগুলি কী কী:
১. ব্যবসার মূল ভিত্তি ও বাজারের আধিপত্য:
- বাজার দখল: ভারতে বিক্রি হওয়া প্রতি ১০০টি টু ও থ্রি-হুইলারের মধ্যে প্রায় ৪০টিরও বেশি গাড়িতে ধূত ট্রান্সমিশনের তৈরি ওয়্যারিং হার্নেস ব্যবহার করা হয়। আর ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) বা ই-রিকশার ক্ষেত্রে এই আধিপত্য আরও বেশি, যা প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি।
- মূল ক্লায়েন্ট: বাজাজ অটো (Bajaj Auto), টিভিএস মোটর (TVS Motor) এবং হোন্ডা মোটরসাইকেল অ্যান্ড স্কুটার ইন্ডিয়ার (HMSI)-র মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি এদের নিয়মিত ক্রেতা। মোট আয়ের প্রায় ৭৭ শতাংশ আসে ওয়্যারিং হার্নেস বিক্রি থেকে এবং বাকিটা আসে ব্যাটারি প্যাক, সেন্সর, কন্ট্রোলার ও সুইচ থেকে।
- গ্রাহক ধরে রাখার ক্ষমতা: প্রতিটি কোম্পানির গাড়ির ডিজাইন অনুযায়ী আলাদা হার্নেস তৈরি হয়। ফলে চাইলেই গ্রাহকরা সহজে অন্য সাপ্লায়ারে শিফট করতে পারেন না। শীর্ষ ৫ জন গ্রাহকের সঙ্গে এই সংস্থার গড় ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রায় ১৩ বছরের।
২. ইভি (EV) বা বৈদ্যুতিক বাহনের জোয়ারে বড় সুযোগ:
সিরিসিল (CRISIL)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আগামী ২০৩১ সালের মধ্যে দেশের টু-হুইলার বাজারে ইভি-র অনুপ্রবেশ বর্তমান ৬.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৫-৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ হার্নেসের বাজার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ১২,০০০ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে। একটি পেট্রলচালিত টু-হুইলারের তুলনায় একটি ইভি-তে ১.৫ থেকে ২.৫ গুণ বেশি হার্নেস বা ক্যাবলিংয়ের প্রয়োজন হয়, যার সরাসরি সুবিধা পাবে ধূত ট্রান্সমিশন।
৩. ঝুঁকির জায়গা ও আর্থিক দুর্বলতা:
- সংকুচিত হচ্ছে প্রফিট মার্জিন: সংস্থার ব্যবসা ভলিউমের দিক থেকে বাড়লেও প্রতি ইউনিটে লাভের পরিমাণ কমছে। অপরিশোধিত তামা (Copper) ও পলিমারের দাম বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো মূল্য সুরক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় এবং অটোমোবাইল কোম্পানিগুলির বার্ষিক দর কষাকষির চাপে সংস্থার অপারেটিং মার্জিন FY24-এর ১৫.৬ শতাংশ থেকে কমে FY26-এ ১২.৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
- ফ্রি ক্যাশ ফ্লো-এর সমস্যা: গত তিন বছরে কোম্পানি অপারেশন থেকে ৯০৯ কোটি টাকা আয় করলেও ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার বা ক্যাপেক্সে ৯৮৫ কোটি টাকা খরচ করেছে, যার ফলে ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ছিল নেতিবাচক (-৭৬ কোটি টাকা)। যদিও সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে তা সামান্য পজিটিভ (২০ কোটি টাকা) হয়েছে, তবুও সংস্থার বড় অঙ্কের খরচ এবং আসন্ন ৪৩৫ কোটি টাকার একটি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বিনিয়োগকারীদের চিন্তায় রাখছে। এছাড়া সংস্থার সঙ্গে ক্লায়েন্টদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি পাকা চুক্তি থাকে না, পুরোটাই রোলিং পার্চেস অর্ডারের (Rolling Buy Orders) ওপর নির্ভর করে চলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধূত ট্রান্সমিশন ভবিষ্যতে ইভি প্রসারের বাজারে একটি দুর্দান্ত দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরি করেছে ঠিকই, তবে আইপিওর উচ্চ মূল্যায়ন ( প্রায় ৪৫ গুণ প্রাইস-টু-আর্নিংস রেশিও) এবং কমতে থাকা অপারেটিং মার্জিনের কারণে বড় ধরনের কোনো ভুলত্রুটির অবকাশ বা সুযোগ এখানে খুব একটা নেই। তাই এই আইপিওতে সাবস্ক্রাইব করার আগে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা এবং কোম্পানির ভবিষ্যৎ আর্থিক বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি ভালো করে খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিচ্ছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

