রায়গঞ্জ: শারদোৎসবের আলোয় যখন সেজে উঠছে চারপাশ, মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার আবাহন, ঠিক তখনই রায়গঞ্জ (Raiganj) শহরের মিলনপাড়ার এক দোতলা বাড়িতে ঘনিয়ে এসেছে নিকষ অন্ধকার। ছেলে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছে পাঁচ বছর আগে। আর ১১ মাস আগে চিরতরে হাত ছেড়েছেন প্রিয় স্ত্রী। ফাঁকা ঘরে জানলার গরাদ ধরে এখন শুধু অনন্ত শূন্যতা আর স্মৃতির পাহাড় নিয়ে দিন গুনছেন সর্বহারা প্রাথমিক শিক্ষক সুব্রত চক্রবর্তী (৫১)।
রায়গঞ্জের মিলনপাড়ার গলির মুখে সুব্রতবাবুর বাড়ি। কলকাতার আশুতোষ কলেজের অঙ্কের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন ছেলে সোমশুভ্র। কিন্তু কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৯ সালের অক্টোবরে আকস্মিক মৃত্যু হয় তাঁর। ক্যানসার আক্রান্ত স্ত্রীর পাশে পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে, পুত্রশোক ভুলে নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করেছিলেন শিক্ষক দম্পতি। কিন্তু সেই আলো ছড়ানো দীপটাও গত বছর শারদোৎসবের ঠিক প্রাক-মুহূর্তে দপ করে নিভে যায়। দীর্ঘ ১১ মাস ধরে সুব্রতবাবু সম্পূর্ণ একা।
দক্ষিণ দিকের ঘরের দেওয়ালে ক্যানসারে প্রয়াত স্ত্রী মধুমিতাদেবীর ফ্রেমে বাঁধানো ছবি, আর ঠিক পাশেই রং-তুলিতে আঁকা ছেলে সোমশুভ্রের হাসিমুখ। সাজানো রিডিং রুম আর ডাইনিং রুম জুড়ে ছড়ানো স্মৃতির ভিড় যেন প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায় শোকগ্রস্ত সুব্রতবাবুকে।
বাড়ি খালি হলেও প্রবেশ মুখের বারান্দায় এখনো জীবিত রয়ে গিয়েছে প্রয়াত ছেলে সোমশুভ্রের স্বপ্ন। সহপাঠী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উদ্যোগে সেখানে গড়ে উঠেছে একটি লাইব্রেরি। বর্তমানে সেখানে সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৩২ জন। প্রয়াত সোমশুভ্রের সহপাঠীরাই এর দেখাশোনার দায়িত্ব সামলান। প্রয়োজন মতো স্থানীয় পড়ুয়ারা এসে আলমারি থেকে রকমারি বই নিয়ে যায়।
পুত্র ও পত্নীহারা সুব্রতবাবু জানান, ছেলের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে এই লাইব্রেরির পরিধি আরও বাড়ানো সহ একাধিক সামাজিক কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
একসময় পুজোর আগে মৃন্ময়ী প্রতিমায় প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতেন সুব্রতবাবু নিজেই। ছোটবেলা থেকেই নিজ হাতে দেবী মূর্তি গড়া ছিল তাঁর চরম শখের কাজ। কিন্তু এ বছর যখন মৃন্ময়ী রূপ পাচ্ছে মণ্ডপে মণ্ডপে, মানুষ আনন্দে মেতে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন আলো ঝলমলে পুজো মণ্ডপ থেকে অনেক দূরে নিজের নির্জন ঘরে নীরব চোখের জলে ছেলে ও স্ত্রীর স্মৃতি আঁকড়ে বসে আছেন সর্বহারা এই শিক্ষক।

