দীপঙ্কর মিত্র, রায়গঞ্জ: স্কুলবাস ও পুলকারের জন্য রাজ্য পরিবহণ দপ্তরের নির্দিষ্ট নিয়ম-নির্দিশিকা রয়েছে। অথচ সেসব হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে রায়গঞ্জের (Raiganj) রাস্তায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হলুদ-নীল স্কুলের বাস। মঙ্গলবারই শিলিগুড়িতে (Siliguri) এসে রাজ্য পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং (Arjun Singh) নথিবিহীন পুলকার নিয়ে সতর্ক করেছেন। কড়া পদক্ষেপ করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। মন্ত্রীর কথার পর কি রায়গঞ্জে পুলকার নিয়ে কোনও অভিযান চালাবে আরটিও বা প্রশাসন? এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
জেলা পরিবহণ দপ্তরের এক আধিকারিক অবশ্য বলেছেন, ‘স্কুলবাস ও পুলকার মালিকদের সরকারি নির্দেশিকা মেনে গাড়ি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পেলে আমরা মাঝেমধ্যে অভিযান চালাই।’
পরিবহণ দপ্তর পুলিশ, শিক্ষা দপ্তর এবং অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠক করে পুলকার সংক্রান্ত গাইডলাইন বা নির্দেশিকা জারি করেছিল। স্কুল, অভিভাবক ও গাড়ি মালিকদের জন্য কাগজ-কলমে রয়েছে অ্যাডভাইজারি কমিটি। কিন্তু বাস্তবে তা কার্যকর নেই। রায়গঞ্জ শহরের বেশকিছু নামীদামি বেসরকারি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের নিজস্ব বাসের পাশাপাশি রয়েছে ভাড়ার বাস। অর্থাৎ, সেই বাসগুলি নাকি সরাসরি অভিভাবক ও বাস মালিকরা মিলে ঠিক করেছেন পড়ুয়া পরিবহণের জন্য। সেক্ষেত্রে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে দায় কার? বিশেষ করে রায়গঞ্জের সুদর্শনপুর, দেবীনগর, কসবা এলাকায় যেসব বেসরকারি স্কুলগুলি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এমন ভাড়ার বাসের সংখ্যাই বেশি।
রায়গঞ্জের সুদর্শনপুরের একটি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের পরিচালন কমিটির সম্পাদক প্রদীপকুমার দত্ত বলেন, ‘দুটি বেসরকারি বাস কালিয়াগঞ্জ ও হেমতাবাদের অভিভাবকরা নিজেরা ভাড়া করেছেন। ছাত্রছাত্রীরা যাতায়াত করে। ওই বাসগুলির মালিকের কাছে আমাদের দেওয়া কোনওরকম ছাড়পত্র নেই। তাই আমরা দায়িত্ব নেব না।’ তাঁর দাবি, ‘আমাদের ১৯টি বাস রয়েছে, সবগুলির স্কুল পারমিট আছে। নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়।’
এছাড়া শহরের অধিকাংশ স্কুলবাস ও পুলকার বহু পুরোনো। যাতায়াতের সময় কালো ধোঁয়ায় ভরে যায় রাস্তা। বৃষ্টি হলেই বাসের ভেতরে জল পড়ে। এজেন্সির মাধ্যমে ভাড়া করা বাসের ক্ষেত্রেই এমন দুর্দশা বেশি। অভিযোগ অভিভাবকদের। হেমতাবাদের বিধায়ক হরিপদ বর্মন স্কুল বাসগুলির বেহাল পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘মেয়েকে স্কুলবাসে ওঠানোর সময় দেখি বেশকিছু স্কুলবাস বহু পুরোনো। বাসগুলি ছাড়তেই কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। দাঁড়িয়ে থাকা পড়ুয়াদের রীতিমতো শ্বাসকষ্ট হয়।’ সঞ্জীব রায় নামে এক অভিভাবকের কথায়, ‘আমার ছেলে ও মেয়ে প্রতিদিন স্কুলবাসে যাতায়াত করে। কিন্তু বাসগুলি সরকারি নিয়ম মেনে একেবারে চলে না। বাসগুলি পুরোনো হয়ে যাওয়ায় কালো ধোঁয়া বের হয়। কষ্ট হয় খুব।’
পরিবহণ দপ্তরের নির্দেশিকা বলা হয়েছে, পুলকারগুলিকে আলাদা করে হলুদ ও নীল রং দিয়ে চিহ্নিত করতে হবে। একইসঙ্গে বৈধ কাগজ থাকাও বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি প্রত্যেক পড়ুয়ার জন্য থাকতে হবে সিট বেল্ট। থাকতে হবে বাইরে থেকে দৃশ্যমান কাচ, পর্যাপ্ত আলো, ব্যাগ রাখার জায়গা, ফার্স্ট এড বক্স। একইসঙ্গে প্রতি স্কুলে একজন করে ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজার বা সহকারী থাকবেন। তিনি নিকটবর্তী পরিবহণ অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। কিন্তু রায়গঞ্জ শহরে পুলকার বা অধিকাংশ স্কুলবাসগুলিতে এসবের কোনও বালাই নেই। বরং বেশকিছু বেসরকারি স্কুলের পুলকারগুলির বেহাল অবস্থা। ঝুঁকি নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বহন করছে। আবার কোথাও টোটো করেও খুদে পড়ুয়ারা যাতায়াত করছে।
এই নিয়ে সরব হয়েছে উত্তর দিনাজপুর বাস ও মিনিবাস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। ইতিমধ্যে তারা জেলা পরিবহণ দপ্তরে বেশ কয়েকবার লিখিত অভিযোগও জানিয়েছেন। স্কুলবাসগুলি এজেন্সি থেকে ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশ্ন তুলেছেন বাস মালিকরা। চেম্বার অফ কমার্সের সাধারণ সম্পাদক শংকর কুণ্ডু বলেন, ‘বাস ভাড়া নেওয়ার আগে স্কুল কর্তৃপক্ষের দেখা উচিত যার থেকে বাস ভাড়া নেওয়া হচ্ছে তার আদৌ কোনও বাস আছে কি না। নিয়মিত ভাড়া না পাওয়ায় ফিটনেস সহ অন্যান্য কাজ অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো করতে পারেন না।’ দশরথ অধিকারী নামে আরেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, ‘আমার মেয়ে সহ আরও বেশ কয়েকজন মিনি ভ্যানে যাতায়াত করে। তাদের স্কুল পারমিট আছে কি না জানা নেই। সরকারি নিয়ম না মানলে মেয়েকে পাঠাব না ওই গাড়িতে।’

