শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: সবরকম চেষ্টা করেও পুরসভার চেয়ারম্যানের চেয়ার ধরে রাখতে পারলেন না রবীন্দ্রনাথ ঘোষ (Rabindranath Ghosh Political Future)। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে প্রথম দিন থেকে যে কয়েকজন নেতা উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের ভিত শক্ত করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। দীর্ঘ সময় জেলা সভাপতির দায়িত্ব সামলানো, মন্ত্রিত্ব, রাজ্য কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া এবং পরবর্তীকালে পুরসভার চেয়ারম্যান- পদপ্রাপ্তির ঝুলিতে খামতি ছিল না কোনওদিন। রবীন্দ্রনাথ যেমন দলের জন্য অনেক করেছেন, তেমনি দলও তাঁকে কখনও নিরাশ করেনি। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে রবীন্দ্রনাথের মাথার ওপর থেকে কোচবিহার পুরসভার চেয়ারম্যানের ছাতাটি সরিয়ে নেওয়া এক অন্য রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এরপর দলে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান কী হবে তা-ই এখন রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ- সকলের চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Ghosh) অবশ্য ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ। তাঁর স্পষ্টকথা, ‘আমি দলের অনুগত সৈনিক। দল যখন যা নির্দেশ দিয়েছে সেই নির্দেশ মেনে কাজ করেছি। আপাতত কোচবিহার জেলার ন’টি বিধানসভা আসনের ন’টিতেই জয়লাভ করাই আমার মূল লক্ষ্য।’ জেলা তৃণমূল নেতাদের অনেকেই বলছেন, ক’দিন আগেই দলের জেলা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে বিশেষ সুবিধা করতে না পারায় আপাতত এর বাইরে কিছু বলার উপায় নেই প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রীর।
পুর চেয়ারম্যান হিসাবে পদত্যাগের পর থেকেই রবীন্দ্রনাথ পড়ে রয়েছেন নাটাবাড়িতে। রাজ্য তৃণমূল সূত্রের খবর, নাটাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে দল এবারেও তাঁকে প্রার্থী করবে। রবীন্দ্রনাথও সেই সিগন্যাল পেয়েছেন। তাই চেনা মাঠে এখন থেকেই ওয়ার্ম আপ শুরু করে দিয়েছেন। উত্তরবঙ্গে বিজেপির উত্থান এবং মেরুকরণের রাজনীতির ঝড়ে রবীন্দ্রনাথের মতো পোড়খাওয়া নেতাও ২০২১-এর নির্বাচনে খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিলেন। নাটাবাড়ি কেন্দ্রে তাঁর পরাজয় তৃণমূলের আস্থায় চিড় ধরিয়েছিল। হারানো জমি পুনরুদ্ধারে দল এখন যে চালটি চালতে চলেছে, তা রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক অস্তিত্বের জন্য মরণবাঁচন লড়াই হয়ে উঠতে পারে।
উন্নয়ন দূরের কথা, বর্তমান বিধায়ক মিহির গোস্বামীকে পাঁচ বছর এলাকায় দেখাই যায়নি। দলীয় বিধায়ককে নিয়ে এই বিড়ম্বনা বাদ দিলে নাটাবাড়ি এখন বিজেপির শক্ত দুর্গ। সেই দুর্গে ফের রবীন্দ্রনাথকে প্রার্থী করা আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে দল তাঁকে পুনরায় সুযোগ দিচ্ছে। তবে এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক কঠোর বাস্তব। যদি নাটাবাড়িতে তিনি ফের পরাজিত হন, তবে তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারে কার্যত যবনিকা পড়ে যাবে। পদ না থাকলে অনুগামীরা যে একসময় নিঃশব্দে সরে যান, জেলায় তার বহু উদাহরণ আছে। তৃণমূলের মতো ডানপন্থী দলে ক্ষমতার বৃত্তের বাইরে থাকা নেতাদের অবস্থা অনেকটা প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতোই। পদহীন রবীন্দ্রনাথ তখন কেবলই এক ‘প্রাক্তন’ হয়ে থেকে যাবেন, যাঁর প্রাসঙ্গিকতা ধূসর হতে বাধ্য।
রবীন্দ্রনাথ প্রার্থী হলে নাটাবাড়িতে যে অনেক হিসেব পালটে যেতে পারে সেকথা মানছেন বিজেপির অনেক নেতাই। তাই তাঁদের টার্গেট যে কোনওভাবে রবীন্দ্রনাথের মনোবল ভেঙে দেওয়া এবং তৃণমূলের ঐক্যে ভাঙন ধরানো। ইতিমধ্যেই সেকাজ শুরু করে দিয়েছেন তাঁরা। কোচবিহারের বিজেপি (BJP) নেতা নিখিলরঞ্জন দে’র কথা, ‘তৃণমূলের যখন কিছুই ছিল না তখন থেকেই রবীন্দ্রনাথকে দেখেছি দলের হয়ে মাটি কামড়ে লড়াই করতে। আমরা জোট করেও বামেদের বিরুদ্ধে লড়েছি। রবীন্দ্রনাথ কোচবিহার থেকে দল চালানোর জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে অর্থসাহায্য পাঠাতেন। এরকম পুরোনো নেতার এই হাল হলে দলেরই ক্ষতি।’
তৃণমূলের অন্দরে কান পাতলে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে। একসময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার এমন হালের জন্য অনেকেই দুষছেন তাঁর ছেলেকে। রবীন্দ্রনাথের ছেলে পঙ্কজ হাল ধরতে গিয়ে বাবার সাজানো-গোছানো রাজনৈতিক বাগান তছনছ করে দিয়েছেন বলে অনুযোগ করছেন রবীন্দ্রনাথের অনেক অনুগামী। তাঁর দুর্বলতার সুযোগে ততদিনে জেলার রাজনীতিতে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল উদয়ন গুহ আর অভিজিৎ দে ভৌমিক জুটি। উদয়নের সঙ্গে একসময় আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক ছিল জগদীশ বর্মা বসুনিয়ার। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের অনুগামী। তৃণমূলের অন্দরেই অভিযোগ, ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচনে জগদীশ প্রার্থী হওয়ায় তলায় তলায় সুতো কাটার চেষ্টা করেছিলেন প্রাক্তন সাংসদ পার্থপ্রতিম রায়। একসময় পার্থ-রবীন্দ্রনাথের মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল। জেলার রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথ পার্থর হাত ধরায় ব্যাপক ক্ষুব্ধ জগদীশ উদয়নের সঙ্গে সমঝোতা করে রবি-বিরোধী শিবিরে চলে যান। ফলে জেলার রাজনীতিতে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথ।
চেয়ারম্যানের পদ থেকে রবীন্দ্রনাথকে সরিয়ে তৃণমূল (TMC) যে বার্তা দিল, তা অত্যন্ত পরিষ্কার- দল এখন নতুন মুখ এবং জয়ের নিশ্চয়তা খুঁজছে। ফলে রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ এখন এক সরু সুতোর ওপর ঝুলছে। যদি তিনি নাটাবাড়িতে মিরাকল ঘটাতে পারেন, তবেই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটবে। অন্যথায়, কোচবিহারের রাজনীতিতে এক সময়ের অবিসংবাদিত এই নেতার বিদায়ঘণ্টা বেজে যাবে নিঃশব্দে।
