উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: বহু বছর ধরে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস) (PCOS) নামে পরিচিত রোগটি এখন পরিচিত পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম (পিএমওএস) নামে (PMOS)। এই নাম পরিবর্তন শুধুমাত্র পরিভাষার পরিবর্তন নয়, এটি এই রোগ সম্পর্কে আমাদের বৈজ্ঞানিক উপলব্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। লিখেছেন শিলিগুড়ির রুদ্রাক্ষ সুপারস্পেশালিটি কেয়ারের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডাঃ অরূন্ধতী দাশগুপ্ত
দীর্ঘদিন ধরে ‘পলিসিস্টিক ওভারি’ শব্দটি রোগী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করতেন, ডিম্বাশয়ে সিস্ট থাকলেই এই রোগ হয়। বাস্তবে তা নয়। পিসিওএস-এ আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে যে সিস্ট দেখা যায়, সেগুলি প্রকৃত অর্থে সিস্ট নয়, সেগুলি অপরিণত ফলিকল। আবার অনেক সুস্থ মহিলার ডিম্বাশয়েও এমন ফলিকল দেখা যেতে পারে, অথচ তাঁদের এই রোগ থাকে না। অন্যদিকে, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে এমন চিত্র নাও দেখা যেতে পারে। এই কারণেই রোগটির নতুন নামকরণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
পিএমওএস-এর পলিএন্ডোক্রাইন শব্দটি বোঝায় যে, এটি শুধু ডিম্বাশয়ের রোগ নয়, বরং শরীরের একাধিক হরমোন সংক্রান্ত রোগ প্রক্রিয়া এর সঙ্গে জড়িত থাকে। ইনসুলিন, ডিম্বাশয়ের হরমোন, অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত অ্যান্ড্রোজেন এবং মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস-পিটুইটারি-ওভারিয়ান অক্ষ – সব মিলিয়ে তৈরি হয় জটিল হরমোনগত ভারসাম্যহীনতা।
মেটাবলিক শব্দটি আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। এই রোগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, স্থূলতা, প্রিডায়াবিটিস, টাইপ-২ ডায়াবিটিস, ফ্যাটি লিভার, রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতা, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকি। অর্থাৎ পিএমওএস শুধু প্রজননজনিত সমস্যা নয়, এটি সমগ্র শরীরকে প্রভাবিত করা একটি দীর্ঘমেয়াদি হরমোন সংক্রান্ত ও বিপাকীয় রোগ।
রোগনির্ণয় কীভাবে
বর্তমানে পিএমওএস নির্ণয়ের জন্য রটারডাম ক্রাইটেরিয়াই ব্যবহৃত হয়। অন্য সম্ভাব্য হরমোন সংক্রান্ত রোগ বাদ দেওয়ার পর নীচের তিনটি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যে কোনও দুটি থাকলে পিএমওএস নির্ণয় করা যায় –
১. অনিয়মিত বা অনুপস্থিত ডিম্বস্ফোটন – যার ফলে মাসিক অনিয়মিত হয় বা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকতে পারে।
২. শরীরে অতিরিক্ত অ্যান্ড্রোজেনের প্রভাব – যেমন মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম, ব্রণ, মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়া অথবা রক্ত পরীক্ষায় অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা বৃদ্ধি।
৩. আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে পলিসিস্টিক ওভারির বৈশিষ্ট্য – শুধুমাত্র আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্ট দেখে কখনও পিএমওএস নির্ণয় করা যায় না। একইভাবে আল্ট্রাসনোগ্রাফি স্বাভাবিক হলেও পিএমওএস থাকতে পারে।
এছাড়া রোগ নির্ণয়ের সময় থাইরয়েডের অসুখ, প্রোল্যাক্টিনের সমস্যা, জন্মগত অ্যাড্রিনাল রোগ, কুশিং সিনড্রোম বা অ্যান্ড্রোজেন-নিঃসরণকারী টিউমারের মতো অন্যান্য হরমোন সংক্রান্ত রোগ বাদ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
চিকিৎসার ধারণাতেও এসেছে পরিবর্তন
আগে চিকিৎসার মূল লক্ষ্য ছিল মাসিক নিয়মিত করা বা সন্তানধারণে সাহায্য করা। এখন লক্ষ্য অনেক বিস্তৃত। আজকের চিকিৎসার উদ্দেশ্য, রোগীর বর্তমান উপসর্গের পাশাপাশি ভবিষ্যতে ডায়াবিটিস, হৃদরোগ, ফ্যাটি লিভার এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি কমানো।
চিকিৎসার প্রথম ধাপ স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ। প্রয়োজনে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমানোর ওষুধ, হরমোন নিয়ন্ত্রণের ওষুধ, ওজন কমানোর আধুনিক ওষুধ কিংবা সন্তানধারণের জন্য বিশেষ চিকিৎসা দেওয়া হয়। অর্থাৎ, চিকিৎসা সম্পূর্ণ ব্যক্তিনির্ভর- একজনের চিকিৎসা অন্যজনের মতো হবে না।
নতুন নামের তাৎপর্য
পিএমওএস নামটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এই রোগকে শুধুমাত্র ডিম্বাশয়ের একটি সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হরমোন সংক্রান্ত ও বিপাকীয় রোগ, যার প্রভাব পড়ে একজন নারীর সার্বিক স্বাস্থ্যের ওপর।
কৈশোরে অনিয়মিত মাসিক, ব্রণ বা অতিরিক্ত লোমের সমস্যা দিয়ে এর শুরু হতে পারে। পরবর্তীকালে সন্তানধারণে অসুবিধা, গর্ভাবস্থায় জটিলতা, ডায়াবিটিস, ফ্যাটি লিভার, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই পিএমওএস-এর চিকিৎসা মানে শুধু মাসিক ঠিক করা নয়, বরং একজন নারীর দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা।
রোগের নামের এই পরিবর্তন আমাদের শেখায়- ডিম্বাশয় এই রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলেও, রোগটি আসলে সমগ্র শরীরের হরমোন ও মেটাবলিজমের ভারসাম্যহীনতার প্রতিফলন। তাই পিএমওএস-কে যত তাড়াতাড়ি শনাক্ত করা যাবে এবং সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা শুরু করা যাবে, ভবিষ্যতের জটিলতা ততটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

