উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: সাফল্যের গতিপথ সব সময় ট্রেন লাইনের মতো সরল চলে না; উত্থান-পতনের খাঁজকাটা পথ ধরেই যে ওউসমানে দেম্বেলে (Ousmane Dembele) একদিন বিশ্বমঞ্চে এভাবে বিস্ফোরণ ঘটাবেন, তা হয়তো ফরাসি ফুটবল জনতাও ভাবেনি। কিন্তু শুক্রবার গভীর রাতে বোস্টনের গ্যালারিতে যখন নীল সমুদ্রের হুল্লোড় থামছে না, তখন মাঠের অধীশ্বর একজনই—উসমানে দেম্বেলে। নরওয়ের বিরুদ্ধে গ্রুপ ‘I’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে মাত্র ৩২ মিনিটের মধ্যে বিধ্বংসী হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজের নাম অমর করে নিলেন এই ফরাসি তারকা। তাঁর অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে নরওয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচই জিতে নকআউটে পা রাখল গতবারের রানার্স-আপ ফ্রান্স।
ম্যাচের শুরু থেকেই নরওয়ের রক্ষণভাগের ওপর আক্রমণের ঝড় তোলে ফ্রান্স, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দেম্বেলে। ডান পায়ের নিখুঁত শটে বল জালের বাঁ কোণে পাঠিয়ে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন তিনি। ডান দিক থেকে চিতার ক্ষিপ্রতায় বক্সে ঢুকে, ডিফেন্স কেটে এক জোরালো শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন। মাত্র ১২ মিনিটের ব্যবধানে, অর্থাৎ ম্যাচের ৩২তম মিনিটে এক দুর্দান্ত বাঁকানো শটে নরওয়ের গোলরক্ষককে পরাস্ত করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন তিনি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে হ্যাটট্রিক করা মাত্র তৃতীয় ফরাসি ফুটবলার হলেন দেম্বেলে। তাঁর আগে এই বিরল কীর্তি গড়েছিলেন কেবল দুই কিংবদন্তি—জাস্ট ফন্তেন (Simply Fontaine) এবং কিলিয়ান এমবাপে (Kylian Mbappe)। ১৯৯৪ সালের পর প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের প্রথমার্ধেই হ্যাটট্রিক সম্পূর্ণ করার অনন্য নজির গড়লেন তিনি।
দেম্বেলের দ্বিতীয় গোলের ঠিক পরেই, ২১ মিনিটে দ্রুত পালটা আক্রমণ থেকে গোল করে নরওয়েকে ম্যাচে ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন থেলো আসগার্ড (Thelo Aasgaard)। তবে ফরাসি দাপটের সামনে তা খড়কুটোর মতো উড়ে যায়। মানা জুড়তেই পারে যে, নরওয়ে এদিন তাদের প্রথম একাদশে আর্লিং হালান্ড, সোরলথ কিংবা ওডেগার্ডের মতো তারকাদের রাখেনি; কিন্তু “বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিক তো বিশ্বকাপ হ্যাটট্রিকই!”
প্রথমার্ধেই ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া ফ্রান্স ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে রাখে। এরপর ইনজুরি টাইমে ফ্রান্সের উদীয়মান তারকা দেসিরে দুয়ে (Need Doue) গোল করে ব্যবধান ৪-১ করেন। এই হারেও অবশ্য নরওয়ের বিদায় ঘটেনি, আগের দুই ম্যাচ জেতায় তারাও শেষ ষোলোর টিকিট কেটেছে।
আজ থেকে প্রায় এক যুগ আগে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর নামী ফুটবল সাংবাদিক বেন লিটলটনকে অফিস থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ভবিষ্যতের উদীয়মান নক্ষত্রদের নিয়ে লিখতে। বিস্তর খুঁজে সে সময় রেনের প্রথম একাদশে সুযোগ না পাওয়া এক লিকলিকে কৃষ্ণকায় কিশোরকে বেছে নিয়েছিলেন লিটলটন। নাম ছিল তাঁর উসমান দেম্বেলে।
লিটলটন প্রতিভা মাপার জন্য সাতটি সূচক বেছে নিয়েছিলেন—রেসিলিয়েন্স, মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিল্পকলা, পরিশ্রমের খিদে, ধাক্কা খেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ধক এবং শেখার আগ্রহ। আজ পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় কিংবা বিশ্বকাপের এই মঞ্চে দেম্বেলের পারফরম্যান্স প্রমাণ করছে লিটলটনের জহুরি চোখ ভুল ছিল না।
অথচ, জার্মানির কিংবদন্তি গোলকিপার অলিভার কান স্টুডিওতে আক্ষেপ করে ঠিকই বলেছেন, “ছেলেটাকে তো কোনও কালে মর্যাদাই দিল না ফ্রান্স! চিরকাল শুধু ক্রিটিসাইজ করে গেল।”
অমিত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিকতার অভাব, চোটের প্রবণতা আর রক্ষণে সাহায্য না করার অপবাদে দেম্বেলে সবসময় ঢাকা পড়েছিলেন কিলিয়ান এমবাপের ছায়ায়। কিন্তু নরওয়ের বিরুদ্ধে এই অপার্থিব হ্যাটট্রিকের পর সমস্ত ক্ষোভ যেন সিয়েন নদীর জলে ধুয়ে মুছে গেল।
এতদিন বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষকে কাঁদিয়ে একা ফ্রান্সকে টানছিলেন কিলিয়ান এমবাপে। শুক্রবারের পর তাঁর পাশে রাজকীয়ভাবে দাঁড়ালেন দেম্বেলে। চলতি বিশ্বকাপে দুজনেরই গোল সংখ্যা এখন সমান—৪টি করে।
বিশ্ব ফুটবলের ডিফেন্ডারদের দশা এখন আইপিএলের বোলারদের মতো হতে বাধ্য। এতদিন শুধু এমবাপেকে আটকাতেই প্রাণ ওষ্ঠাগত হতো, এখন তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেম্বেলের এই বিধ্বংসী রূপ। বিশ্ব ফুটবলে রাজত্ব করতে ধেয়ে আসছে নতুন এক জুটি—‘দে-ম্বাপে’।

