কল্লোল মজুমদার ও সায়ন দে, মালদা ও আলিপুরদুয়ার : মালদা থেকে কয়েক হাজার কিমি দূরে রয়েছে দিল্লি। মুম্বইও তাই। আবার আলিপুরদুয়ার থেকে অসমের দূরত্ব কয়েকশো কিলোমিটার। কিন্তু মালদা, আলিপুরদুয়ার, দিল্লি, মুম্বই হোক বা অসম- পুজোর আগে আগে উত্তরবঙ্গের ঢাকিদের দীর্ঘনিঃশ্বাসে কোথাও যেন একসঙ্গে মিলে যাচ্ছে এই জায়গাগুলো। কেন?
মন্দিরের চাতালে উদাস মনে বসে ছিলেন সুধীর রবিদাস। পাশে রাখা ছিল ঢাকটা। ‘কী গো এবার কোথায় যাচ্ছ? দিল্লি না মুম্বই?’ প্রশ্ন শুনে ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘দিল্লি থেকে ডাক এসেছিল। কিন্তু ভয়ে যেতে পারছি না। যদি বাংলা কথা শুনে বাংলাদেশি ভেবে নিয়ে হেনস্তা করে আমাকে।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সুধীর। তারপর বললেন, ‘শুধু আমি নয়, এবার আর মালদা থেকে কেউই পুজোর ঢাক বাজাতে ভিনরাজ্যে যেতে চাইছেন না। উপার্জনের রাস্তাটাই বন্ধ হয়ে গেল।’
মালদা জেলার ইংরেজবাজার, মানিকচক, পুরাতন মালদায় হাজারখানেক রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। তাঁদের পেশা পুজো-পার্বণে ঢাক বাজানো। সারা বছর সেই ঢাকিরা নিজেদের এলাকায় থাকলেও দুর্গাপুজোর সময় পাড়ি দেন দিল্লি, মুম্বই, হরিয়ানা সহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে। ভিনরাজ্যে অন্যান্য কাজে যেমন উপার্জন বেশি, তেমনি ঢাক বাজালেও টাকা মেলে বেশি। কিন্তু এবার দিল্লি, মুম্বই থেকে ডাক এলেও হেনস্তার ভয়ে যেতে নারাজ অধিকাংশ ঢাকি।
এই ছবিটা কিন্তু কেবল মালদার নয়। আলিপুরদুয়ার শহরের ঢাকিপাড়াতেও যেন হতাশার আবহসংগীত বাজছে। শহরের ক্লাবগুলি বায়না করলে যা টাকা দেয়, তার থেকে ঢের বেশি টাকা দেন অসমের দুর্গাপুজোর উদ্যোক্তারা। তাই পুজোর কয়েকটা দিন শহর ছেড়ে অনেকেই পাড়ি দেন অসমে। এবছর সেই গুড়ে বালি পড়েছে। বাঙালি বিদ্বেষ নিয়ে যে চর্চা চলছে, সেই পরিস্থিতিতে অসম থেকে সেভাবে বায়নাই হয়নি আলিপুরদুয়ারের ঢাকিদের। অন্যবারের মতো বায়না আসেনি অরুণাচলপ্রদেশ বা দিল্লি থেকেও। এলাকার ঢাকি শ্যামল দাসের গলায় তাই ঝরে পড়ল হতাশা। বললেন, ‘আমাদের আট-দশজনের একটা দল আছে। গত ৭ বছর ধরে আমরা অসমের গুয়াহাটিতে বিভিন্ন দুর্গাপুজোয় ঢাক বাজিয়ে আসছি। সেখানকার পুজো কর্তৃপক্ষ আমাদের তিন মাস আগেই বায়না দিয়ে রাখে। এবার তো পুজোর আর এক মাস বাকি। কেউ যোগাযোগই করেনি।’
কেউ বায়না পাননি, কেউ যাচ্ছেন না ভয়ে। ইংরেজবাজারের মানিকপুর গ্রামের ঢাকি হেমন্ত রবিদাস যেমন হিন্দি বা ইংরেজি বলতে পারেন না। তাই তাঁর আশঙ্কা, ‘বাংলায় কথা বলি। বাংলায় কথা বললেই তো হেনস্তা করছে। তাই দিল্লি থেকে পুজোর ঢাক বাজানোর ডাক এলেও যাচ্ছি না। বাড়ির লোকেদেরও আপত্তি আছে।’
দিল্লিতে গেলে চারদিনের ঢাক বাজিয়ে ৩০-৪০ হাজার টাকা আয় হয়। মুম্বই গেলে আরও বেশি। আর স্থানীয় ক্লাবে বাজিয়ে মেলে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। কয়েকগুণ বেশি উপার্জনের পথটাই বন্ধ। আলিপুরদুয়ারের পলাশবাড়ির চরের বাসিন্দা, পেশায় ঢাকি সুজিত ঢাকি বলছিলেন, ‘এবার বাইরের কোনও রাজ্য থেকেই আমাদের ঢাক বাজানোর জন্য কেউ বলেনি। তবে শহরের কিছু পুজো কমিটি থেকে বাজানোর জন্য বলেছে। কম টাকা পেলেও একদম ঘরে বসে তো থাকা যায় না।’
স্থানীয় ঢাকিরা তো বাইরে চলে যান অন্যান্যবার। তপন সরকারের মতো আলিপুরদুয়ার শহরের পুজো কমিটির সদস্যরা ভরসা করেন বাইরে থেকে আসা ঢাকিদের ওপর। এবার পরিস্থিতি অন্য। তপন বলছিলেন, ‘এবছর আমরা স্থানীয় ঢাকিকেই পুজোয় বায়না দিয়েছি।’
কম টাকায় নিজের এলাকায় বাজালে কি আর খুশির বোল ফুটবে সুধীর-শ্যামলের ঢাকে?
