NH 10 | তিস্তাগর্ভে রাস্তা! সুড়ঙ্গেই ভবিষ্যতের পথ

NH 10 | তিস্তাগর্ভে রাস্তা! সুড়ঙ্গেই ভবিষ্যতের পথ

শিক্ষা
Spread the love


বর্ষা এলেই উত্তরবঙ্গের মানচিত্র থেকে যেন ছিটকে যায় পাহাড়ের একটা বড় অংশ। সেবক থেকে রংপো পর্যন্ত ১০ নম্বর জাতীয় সড়ক (NH 10), যা সিকিম এবং কালিম্পংয়ের লাইফলাইন, তা আজ আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বারবার ধস, রাস্তা বসে যাওয়া এবং হাইওয়ের একটা বড় অংশ তিস্তাগর্ভে বিলীন হওয়াটা এখন আর কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এক ভয়ংকর বার্ষিক রুটিন। দিনের পর দিন রাস্তা বন্ধ থাকায় চরম সংকটে পড়ছে রাজ্যের পর্যটন শিল্প। এই অচলাবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে উত্তরবঙ্গ সংবাদ শুধুমাত্র পরিকাঠামোর ত্রুটি বা প্রশাসনের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুলে দায়িত্ব সারতে চায় না। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি পাহাড়প্রমাণ সমস্যারই একটি বিজ্ঞানসম্মত সমাধান রয়েছে। তাই ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে শহরের বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ, ভূতত্ত্ববিদ, জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের (এনএইচএআই) ইঞ্জিনিয়ার এবং বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশনের (বিআরও) বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। লক্ষ্য একটাই- পাহাড়ের বিকল্প এবং অল-ওয়েদার লাইফলাইনের একটি বাস্তবসম্মত ‘টেকনো-ইকনমিক ব্লু-প্রিন্ট’ বা রূপরেখা তৈরি করা।

ভূতত্ত্ববিদদের সতর্কবার্তা

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে প্রথম যে নির্মম সত্যটি উঠে এসেছে তা হল, ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের অ্যালাইনমেন্ট বা রূপরেখার আর কোনও ভূতাত্ত্বিক ভবিষ্যৎ নেই। এর নেপথ্যে রয়েছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক কারণ।

১. হিমালয় একটি নবীন ভঙ্গিল পর্বতমালা। এখানকার মাটি অত্যন্ত আলগা এবং পাথরের স্তরগুলি অত্যন্ত ভঙ্গুর। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, সেবক থেকে রংপো পর্যন্ত পাহাড়ের ঢাল এতটা খাড়াই যে, সামান্য কম্পন বা বৃষ্টিতেই স্লিপ প্লেন বরাবর মাটি ও পাথর হুড়মুড়িয়ে নেমে আসে।

২. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এখন বৃষ্টির ধরন পালটে গিয়েছে। সারাদিন ধরে ঝিরঝিরে বৃষ্টির বদলে এখন অত্যন্ত অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এর জেরে তিস্তার গতিপথ ও নাব্যতা ভয়াবহভাবে বদলাচ্ছে। নদীর জলস্তর আচমকা বেড়ে গিয়ে পাহাড়ের পাদদেশে থাকা রাস্তার ভিত কেটে দিচ্ছে

৩. পাহাড়ের গা ঘেঁষে থাকা বর্তমান জাতীয় সড়কটি ক্রমশ অবলুপ্তির দিকে এগোচ্ছে। নদীর পাড় বাঁধানো বা ধসপ্রবণ এলাকায় গার্ডওয়াল দেওয়ার মতো ‘তাপ্পি মারা’ কাজ করে আর যাই হোক কোনও স্থায়ী সমাধান হবে না

বিকল্প রুটের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

বর্তমান ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর চাপ কমাতে একটি বিকল্প পথের কথা বারবার উঠে আসে। সেটি হল গরুবাথান হয়ে লাভা এবং আলগাড়া দিয়ে সিকিম বা কালিম্পং পৌঁছানোর রুট। জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের ইঞ্জিনিয়াররা এই রুটটিকে একটি উন্নতমানের দ্বিতীয় লাইফলাইন হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছেন।

সবচেয়ে বড় সুবিধা : এই রাস্তাটি নদীখাত থেকে অনেকটাই উঁচুতে অবস্থিত। ফলে তিস্তায় হড়পা বা ফ্লাশ ফ্লাডের কোনও ভয় এখানে নেই। বন্যার জেরে রাস্তা ধুয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এই রুটে প্রায় শূন্য।

ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা : সমস্যা হল পাহাড়ের খাড়াই বা গ্রেডিয়েন্ট এবং রাস্তার বাঁক। এখানকার হেয়ারপিন বেন্ডগুলো অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। ভারী পণ্যবাহী ট্রাক, ১৮ চাকার লরি বা মাল্টি-অ্যাক্সেল গাড়ি, যা সিকিমের মতো রাজ্যের অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বা সামরিক সরঞ্জাম বহনের জন্য অপরিহার্য, সেগুলির পক্ষে এই বাঁকগুলো পার হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

পরিবেশগত লাল সংকেত : এই রুটটিকে মূল লাইফলাইনে পরিণত করতে গেলে রাস্তার আমূল সম্প্রসারণ প্রয়োজন। কিন্তু লাভা সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা নেওড়াভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের ইকো সেনসিটিভ জোনের অন্তর্গত। পাহাড় কেটে রাস্তা আরও চওড়া করতে গেলে ব্যাপক মাত্রায় জঙ্গল কাটতে হবে, যা পরিবেশগত ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে এক বিরাট আইনি ও বাস্তুতান্ত্রিক বাধা তৈরি করবে।

বিশেষজ্ঞদের মত : এই রুটটিকে ভারী যানবাহনের জন্য মূল হাইওয়ে হিসেবে ব্যবহার করা অবাস্তব। তবে, এটিকে প্রশস্ত করে শুধুমাত্র যাত্রীবাহী যান, ছোট বাস, পর্যটকদের গাড়ি এবং হালকা বাণিজ্যিক পণ্যের জন্য একটি ডেডিকেটেড অল-ওয়েদার প্যাসেঞ্জার রুট হিসেবে গড়ে তোলা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।

সুড়ঙ্গপথ বা টানেল

গরুবাথান রুট যদি ভারী লরি বা সামরিক রসদের জন্য উপযুক্ত না হয়, তবে উপায় কী? বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশনের (বিআরও) বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাহাড়ের গায়ে রাস্তা বানানোর চেয়ে পাহাড়ের বুক চিরে সুড়ঙ্গ তৈরি করাকে অনেক বেশি সুরক্ষিত, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বলে মনে করা হচ্ছে।

বাইপাস টানেলিংয়ের ধারণা : ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের পুরো ৯২ কিলোমিটার অংশজুড়ে সুড়ঙ্গ করার প্রয়োজন নেই। বিআরও-র বিশেষজ্ঞদের মতে, লিকুভির, ২৯ মাইল, শ্বেতিঝোরা, সেবক কালীবাড়ি কিংবা পাগলাঝোরা- যেখানে ধসের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি এবং যে পয়েন্টগুলোতে হাইওয়ে বারবার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সেই নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। এরপর পাহাড়ের গা বেয়ে রাস্তা না নিয়ে গিয়ে, ওই বিপজ্জনক অংশটুকুর পেছনে থাকা পাহাড়ের নিরেট পাথরের ভেতর দিয়ে ছোট ছোট ‘বাইপাস টানেল’ তৈরি করতে হবে।

প্রযুক্তির ব্যবহার : হিমাচলপ্রদেশের অটল টানেল বা কাশ্মীরের পীরপঞ্জাল সুড়ঙ্গপথ যদি সফল হতে পারে, তবে দার্জিলিং-কালিম্পং পাহাড়ে তা অসম্ভব হওয়ার কোনও কারণ নেই। আধুনিক টানেল বোরিং মেশিন (টিবিএম) এবং ড্রিল-অ্যান্ড-ব্লাস্ট প্রযুক্তির সাহায্যে মাটির তলার শক্ত পাথর ভেদ করে সুড়ঙ্গ তৈরি করলে তা বাইরের ধস বা তিস্তার জলোচ্ছ্বাস থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকবে।

পরিবেশের ক্ষতি হ্রাস : পাহাড়ের ওপরের স্তরে গাছ কেটে বা ডিনামাইট ফাটিয়ে রাস্তা বানালে বাস্তুতন্ত্রের যে ক্ষতি হয়, সুড়ঙ্গপথে তার লেশমাত্র প্রভাব পড়ে না। ওপরের জঙ্গল বা বন্যপ্রাণের রুটিন অক্ষুণ্ণ রেখেই নীচ দিয়ে মসৃণভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারে।

খরচের অঙ্ক ও দীর্ঘমেয়াদি লাভ

যে কোনও বৃহৎ পরিকাঠামো প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কাঁটা হল তার বিপুল খরচ। সুড়ঙ্গপথ নির্মাণের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। হিমালয়ের এই অংশের ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর কারণে সিসমিক সার্ভে ও মাটি পরীক্ষা করতে প্রচুর সময় লাগবে এবং টানেল বানানোর প্রাথমিক বিনিয়োগ সাধারণ হাইওয়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি হবে (প্রতি কিলোমিটারে কয়েকশো কোটি টাকা)। তবে অর্থনীতিবিদ এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা এখানে একটি অন্য হিসেব সামনে রাখছেন, যাকে বলা হয় বেনিফিট-কস্ট রেশিও।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *