উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে (Bengal Meeting Bypolls) চেনা রাজনৈতিক উত্তাপের পাশাপাশি ভোটদানের হারেও নজরকাড়া পরিসংখ্যান উঠে এল। বিকেল ৫টা পর্যন্ত নন্দীগ্রামে ৭৯.৩৯ শতাংশ এবং রেজিনগরে ৭৮.৪২ শতাংশ ভোটদানের খবর মিলেছে। তবে এই বিপুল অংশগ্রহণের নেপথ্যে দিনভর বুথ দখল, পোলিং এজেন্টদের ঘাড়ধাক্কা দেওয়া এবং অবাধ ছাপ্পার অভিযোগ ঘিরে রাজনৈতিক পারদ ছিল তুঙ্গে। বিরোধীদের নিশানায় ছিল মূলত শাসকদল।
নন্দীগ্রামের হাইভোল্টেজ লড়াইয়ে সকালেই টোটোয় চেপে নন্দনায়কবাড়ের নির্দিষ্ট বুথে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। উল্লেখ্য, জোড়া কেন্দ্রে জয়ের পর নিয়ম মেনে ভবানীপুর নিজের কাছে রেখে নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। সেই আসনেই এবার তাঁর প্রয়াত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। ভোট দিয়ে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাসী ভবিষ্যদ্বাণী, শেষ পর্যন্ত ভোটদানের হার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ছোঁবে। ২০১৬ সালের বিধানসভায় ৮২ হাজার ভোটে জয়ের পুরনো নজির টপকে যাওয়ারও দাবি করেন তিনি। রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য তো আরও একধাপ এগিয়ে গতবারের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি মার্জিনে জয়ের দাবি করেছেন।
বেলা ১টার মধ্যে নন্দীগ্রামে ভোট ৬০ শতাংশ ছাড়ালেও বিরোধীদের অভিযোগের পাহাড় জমতে থাকে। পুলিশি অতিসক্রিয়তার অভিযোগে কংগ্রেসের ব্লক সভাপতি আশরাফুল তুল্লার আটক হওয়া নিয়ে বিতর্ক ছড়ায়। ভোট লুটের সরব প্রতিবাদে শামিল হয় সিপিএম এবং আইএসএফ-ও। আইএসএফ সুপ্রিমো তথা ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি সমাজমাধ্যমে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ করে লেখেন, ‘নির্বাচনী আপডেট: অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় বাহিনী নন্দীগ্রামে অবৈধ জমায়েত হটাতে গেলে স্থানীয় মহিলারা ভোটার স্লিপ কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ জানান। কেন্দামারিতে এক তৃণমূল নেতার দোকান ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে।
অন্যদিকে, রেজিনগরের চিত্রনাট্যও ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। জোড়া কেন্দ্রে জিতে রেজিনগর ছেড়ে নওদার বিধায়ক পদটি বেছে নিয়েছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর (Humayun Kabir)। এই কেন্দ্রে ছেলে গোলাম নবি আজাদকে প্রার্থী করেছেন তিনি। সকালে ভোট দিয়ে বেরিয়েই রাজ্য প্রশাসন ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে হুমায়ুন বলেন, ‘উপনির্বাচনের পরিস্থিতি দেখে দেশের এমার্জেন্সির কথা মনে পড়ে গেল, ভোট করাবার দরকার কী ছিল!’ তবে বেলা গড়াতেই পুলিশকে হুমকি এবং নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
পাশাপাশি, সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ১৫ মিনিটের একটি অডিও ক্লিপকে কেন্দ্র করে রেজিনগর থানার পুলিশের বিরুদ্ধে তকিপুর এলাকার চারটি বুথে এজেন্ট বসতে না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। সেখানে থানার বড়বাবুর উপস্থিতিতেই এজেন্টদের আটকে রাখার কথা শোনা যায়। বেলা ১টায় ভোট ৫৬ শতাংশ পেরোলে বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলি একজোট হয়ে প্রতিবাদে নামে। ‘মমতা তৃণমূল কংগ্রেস’-এর প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী এবং ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল প্রার্থী শফিউজ্জামান শেখ অভিযোগ করেন যে, বুথগুলিতে কেবল বিজেপির এজেন্টদেরই বসতে দেওয়া হয়েছে। ক্ষুব্ধ কংগ্রেস প্রার্থী রেজিনগর থানার সামনে ধর্নায় বসেন এবং জেলাশাসকের দফতর পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী। পুলিশ পর্যবেক্ষক ও জেলাশাসককে ফোনে না পেয়ে ক্ষোভ উগরে তিনি বলেন, ‘বোমা-গুলি না পড়লেও পুলিশ নির্বিঘ্নে নীরব সন্ত্রাস চালিয়েছে। ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। ধর্ম দেখে ভোটারদের বুথে যেতে দেওয়া বা বাধা দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘এক মাঘে শীত যায় না!’
গোটা প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তিনি বলেন, ‘যখন সারা দেশ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল, তখন বাংলায় নির্বাচন কমিশন নির্লজ্জভাবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে উপনির্বাচনে কারচুপির এক নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। এই ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগকেই আরও জোরালো করল। এমনকি, রেজিনগরে সিপিআই(এম) প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টকেও ভোট দিতে দেওয়া হয়নি।’ নির্বাচনকে প্রহসন আখ্যা দিয়ে হুমায়ুন-পুত্র গোলাম নবি আজাদ ফল গণনার দিন বয়কটের ডাক দিয়ে জানিয়েছেন।, যদিও সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, নির্বাচন সম্পূর্ণ অবাধ হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘রেজিনগরে বিজেপির জয় অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না, কিন্তু সেখানকার সংখ্যালঘুরাও এখন আর বাবরি মসজিদ চান না, উন্নয়ন আর কারখানা চান।’

