Murshidabad | দানবাক্সে কোটি টাকা, শিক্ষায় ভাঁড়ে মা ভবানী: মুসলিম সমাজের অগ্রাধিকার ঠিক করবে কে?

Murshidabad | দানবাক্সে কোটি টাকা, শিক্ষায় ভাঁড়ে মা ভবানী: মুসলিম সমাজের অগ্রাধিকার ঠিক করবে কে?

ব্লগ/BLOG
Spread the love


কলকাতাঃ মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) জেলার রেজিনগর আজ এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী। তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীর ডাক দিয়েছেন ‘দ্বিতীয় বাবরি মসজিদ’ গড়ার। আর সেই ডাকে সাড়া দিয়ে আবেগের বাঁধ ভেঙেছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় দানবাক্স উপচে পড়েছে ২ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকায়! কেউ হাতের বালা খুলে দিচ্ছেন, কেউ নিজের জমানো শেষ সম্বলটুকু তুলে দিচ্ছেন। দৃশ্যটি নিঃসন্দেহে আবেগমথিত। কিন্তু এই প্রবল আবেগের স্রোতে দাঁড়িয়ে কিছু কঠিন ও অপ্রিয় প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।

পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ, যারা আর্থ-সামাজিক সূচকে রাজ্যের অধিকাংশ জেলার তলানিতে অবস্থান করছে, তাদের কাছে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কী? একটি বিশাল ইমারত, নাকি তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য একটি মজবুত ভিত্তি?

আবেগ যখন যুক্তিকে গ্রাস করে

ধর্মীয় স্থানে দান করা ইসলামে অত্যন্ত পুণ্যের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ইসলাম কি কেবল মসজিদ গড়তেই শেখায়, নাকি মানুষ গড়তেও? যে বিপুল অর্থ—প্রায় ৩ কোটি টাকা—মাত্র দু’দিনে জমা পড়ল, সেই টাকা দিয়ে মুর্শিদাবাদ বা মালদার মতো পিছিয়ে পড়া জেলায় কী কী হতে পারত?

ভাবুন তো, এই টাকায় যদি একটি আধুনিক মানের আবাসিক স্কুল বা কলেজ তৈরি হতো? কিংবা একটি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, যেখানে বিনা পয়সায় গরিব মানুষ চিকিৎসা পেতেন? হুমায়ুন কবীরের এই উদ্যোগে আবেগ আছে ষোল আনা, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাব প্রকট। বাবরি মসজিদের নাম ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক মেরুকরণের খেলায় হয়তো জিতবেন, কিন্তু সমাজ কি তাতে এক কদমও এগোবে?

আল-আমিন মিশনের শিক্ষা: নীরব বিপ্লব

দান করার আগে আমাদের একবার তাকানো উচিত আল-আমিন মিশন, রহমতে আলম মিশন বা জিডি চ্যারিটেবল সোসাইটির দিকে। এরা কোনো রাজনৈতিক হুঙ্কার ছাড়েনি, বাবরি মসজিদের নামে আবেগ উসকে দেয়নি। বরং নীরবে, নিভৃতে হাজার হাজার গরিব, মেধাবী ছাত্রছাত্রীকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং আমলা তৈরি করছে।

আল-আমিন মিশন আজ বাংলার সংখ্যালঘু শিক্ষার ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। তাদের হাত ধরে অজপাড়াগাঁয়ের দিনমজুরের ছেলে ডাক্তার হচ্ছে, বিড়ি শ্রমিকের মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অর্থের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়। তাদের জাকাত ফান্ডের ওপর নির্ভর করতে হয়। আজ যারা হুমায়ুন কবীরের ডাকে কোটি কোটি টাকা ঢালছেন, তারা কি কখনো ভেবেছেন এই টাকাটা আল-আমিন বা রহমতে আলমের মতো কোনো সংস্থাকে দিলে কতগুলো এতিম শিশুর জীবন বদলে যেত?

নারীশিক্ষা ও স্বাস্থ্য: উপেক্ষিত অধ্যায়

মুর্শিদাবাদ জেলায় নারী শিক্ষার হার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা আজও তথৈবচ। অপুষ্টি, স্কুলছুট ছাত্রীর সংখ্যা, এবং বাল্যবিবাহ—এই সমস্যাগুলো আজও সমাজকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ২.৮৫ কোটি টাকা দিয়ে অন্তত ৫০টি গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভোল বদলে দেওয়া যেত। কিংবা হাজার হাজার মেয়ের উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা যেত।

মসজিদ অবশ্যই প্রার্থনার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহ কি কেবল অট্টালিকায় বাস করেন? যে শিশুটি অর্থের অভাবে স্কুলে যেতে পারে না, যে মা চিকিৎসার অভাবে ধুঁকে মরে—তাদের সেবা করা কি ইবাদত নয়? সমাজসেবীরা বারবার বলছেন, মুসলিম সমাজের এখন প্রয়োজন ‘কংক্রিটের জঙ্গল’ নয়, বরং ‘হিউম্যান রিসোর্স’ বা মানব সম্পদ উন্নয়ন।

অগ্রাধিকার বাছার দায়

হুমায়ুন কবীর একজন রাজনীতিবিদ। তিনি জানেন কোন আবেগে সুড়সুড়ি দিলে ভোটবাক্স এবং দানবাক্স—দুটোই ভরবে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে আজ সজাগ হতে হবে। ধর্ম মানুষকে পথ দেখায়, অন্ধ করে না। আজ যদি মুসলিম সমাজ তাদের দানের টাকার ১০ শতাংশও মসজিদ-মাদ্রাসার ইমারত ছেড়ে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান চর্চা, এবং স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করত, তবে সাচার কমিটির রিপোর্ট হয়তো অন্যরকম হতো। বাবরি মসজিদের নামে মসজিদ গড়লে হয়তো ইতিহাসের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া যাবে, কিন্তু শিক্ষার মিনার গড়লে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার—আমরা কি কেবল অতীতের আবেগে বাঁচব, নাকি ভবিষ্যতের জন্য একটি সক্ষম, শিক্ষিত ও সুস্থ সমাজ গড়ে তুলব? মনে রাখবেন, আল্লাহ তাদেরই সাহায্য করেন, যারা নিজেদের সাহায্য করে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *