কল্লোল মজুমদার, মালদা: ২৩ জানুয়ারি হোক কিংবা ২৬ জানুয়ারি বা ১৫ অগাস্ট। শুধু এই দিনগুলোতেই মনে পড়ে শান্তি সেন, তরুবালা সেন, উমা রায় কিংবা রাধেশচন্দ্র শেঠের নাম। মালদা শহরে তাঁদের নামে রয়েছে একটি করে রাস্তা। রাস্তার পাশে তাঁদের নাম লেখা ফলক। (Malda Forgotten Heroes) মালদা শহরে এই রাস্তাগুলি কোথায়, সেটাই বা কতজন জানেন? একটা সময় এলাকায় কিছু বোর্ড লাগানো থাকলেও এখন আর তা খুঁজে পাওয়া যায় না। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে এই মানুষগুলির ভূমিকা কতটা ছিল, তা আদৌ কি জানতে চায় বর্তমান মালদা?
রবিবার সকাল নয়টা। মালদা শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা ফোয়ারা মোড়ে এক প্রবীণ বাসিন্দা শ্যামল চৌধুরী দাঁড়িয়েছিলেন টোটো ধরার জন্য। দুই হাতে ব্যাগভর্তি বাজার। একটা টোটো ফাঁকা দেখতেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তরুবালা সেন সরণি যাব। কত নেবে?’ ওই টোটোচালক রীতিমতো অবাক হয়ে যান। ‘যাব না’ বলেই টোটো চালাতে শুরু করেন। শ্যামল আবার টোটোকে দাঁড় করিয়ে বলে ওঠেন, ‘আরে বাবা, অমুক বেকারির পাশের গলিতে।’ এবার গন্তব্য বুঝতে পারেন টোটোচালক।
এখন আর কেউ মনে না রাখলেও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মালদা জেলার এই তরুবালা সেনের নাম অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। অথচ তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে মালদার মানুষ আজও অন্ধকারে। অল্প বয়সেই তরুবালা তাঁর ননদ সুরবালাদেবীর হাত ধরে সম্ভবত অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লাঠি ও ছোরা খেলা সহ বাঘনখ ব্যবহার ও আত্মরক্ষার নানাবিধ প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৩২-’৩৩ সালে আইন অমান্য আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণ করেন।
মালদা শহরে যে রাস্তাটি রাজমহল রোড নামে পরিচিত, খাতায়-কলমে তার আসল নাম কিন্তু বলদেবানন্দ গিরি রোড। মালদা শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম রাস্তার মধ্যে এটি একটি। বড় বড় শপিং মল, পেট্রোল পাম্প, ওষুধের দোকান, খাবার দোকান কী নেই এই এলাকায়? এই এলাকার যানজটের কথা সবাই জানে, কিন্তু যাঁর নামে এই রাস্তা, সেই বলদেবানন্দ গিরি কে ছিলেন, তা জানেনই না মালদার অধিকাংশ মানুষ। বলদেবানন্দ গিরি ছিলেন দশনামী সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তি। বিভিন্ন সময় মালদায় আসা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, সরোজিনী নাইডুর মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিতেন তিনি।
এই বলদেবানন্দ গিরি রোডের এক পাশে প্রতিদিন ডালপুরি বিক্রি করতে বসেন বেশ কয়েকজন বিক্রেতা। রবিবার সকালে ওই ডালপুরির দোকানে এসেছিলেন দুই পড়ুয়া অমল চক্রবর্তী আর সোমেশ অধিকারী। জিজ্ঞাসা করতেই তাঁদের সাফ জবাব, আমরা তো এই এলাকাকে রাজমহল রোড নামেই চিনি।
মালদা শহরের আরেক ব্যস্ত এলাকা নেতাজি মোড়। নেতাজি মোড় থেকে পূর্ব প্রান্তে মহানন্দা নদীর দিকে যে রাস্তা চলে গিয়েছে সেই রাস্তার নাম খাতায়-কলমে রাধেশচন্দ্র রোড। বছরখানেক আগে ইংরেজবাজার পুরসভা ওই এলাকায় মালদা জেলার অন্যতম স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা সাংবাদিক রাধেশচন্দ্র শেঠের মূর্তি বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এখনও অবধি তা বাস্তবায়িত হয়নি। অথচ এই মানুষটির জন্য উদ্বুদ্ধ হয়ে এই জেলার কত তরুণ স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। ওই এলাকার ব্যবসায়ী তরুণ দে বলছিলেন, ‘সত্যিই এইসব মানুষের জীবনী নিয়ে এলাকায় বোর্ড থাকা খুব জরুরি। তাতে এলাকার মানুষ সহ মালদার মানুষ জানতে পারবেন তাঁদের কথা। না হলে এলাকার নাম থেকে যাবে শুধুই পোস্টাল অ্যাড্রেসে।’
খালি এই তিনজনই নয়, মালদা শহরে স্বাধীনতা সংগ্রামী শান্তি সেন, উমা রায়ের নামেও রাস্তার নামকরণ হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কর্মকাণ্ড মালদার মানুষের কাছে আজ অজানা। মালদার শিক্ষক অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত দাবি তুলেছেন, ‘রাস্তার নামের সঙ্গে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কর্মকাণ্ডের সংক্ষিপ্ত পরিচয় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরা উচিত। তবেই ওই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের যথার্থ সম্মান দেওয়া হবে।’
