রক্তপাতহীন। সন্দেহ নেই। নিরুপদ্রব। দ্বিমত নেই। অবাধ! তাও বলা যায়। কিন্তু সুষ্ঠু কি? প্রশ্নটা থেকেই গেল। নির্বাচন কমিশনের কড়াকড়ি ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভারী বুটের শব্দ এক ধরনের ত্রাস তৈরি করেছে। যাঁরা হিংসার শরিক হন বা মদত দেন, তাঁদের জন্য তো বটেই। রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এমন নির্বাচন হয়। ৯৯ শতাংশের মতো ভোটের হার থাকে। রক্তপাতহীন হয়।
কিন্তু বন্দুকের নলের মুখে সেই নির্বাচনগুলিকে আদৌ সুষ্ঠু (ইংরেজিতে honest) বলা যায় কি? পশ্চিমবঙ্গে এমন লাশহীন নির্বাচন সাম্প্রতিককালে হয়নি। স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচন থেকে অপ্রীতিকর ঘটনাবিহীন এমন ভোট নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। যে কারণে নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে ধন্য ধন্য হচ্ছে। কমিশনের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত থাকলেও তৃণমূল বা বামেরা খুব বেশি বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেয়নি। যদিও ভোটপর্বের সমস্ত নির্ধারিত সূচক নির্বাচন কমিশন সাফল্যের সঙ্গে উতরে গিয়েছে- এমন কথা বলা মুশকিল।
বিনা হিংসায় অবাধে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়া মানেই নির্বাচন সুষ্ঠু নাও হতে পারে। প্রথম কথা, সাংবিধানিকভাবে সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পালন নিয়ে নির্বাচন কমিশন বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, যে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন, তাঁদের অধিকাংশ ভারতের বৈধ নাগরিক। এই তথ্য স্বীকৃতি পেয়েছে ট্রাইবিউনালের বিচারে। যৌক্তিক অসংগতির নামে ওই ২৭ লক্ষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল।
তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৪৬৮ জনের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে ট্রাইবিউনাল। ১৪৭৪ জনের আবেদন খতিয়ে দেখার ভিত্তিতে ওই বিচার। এতে স্পষ্ট, ওই ১৪৭৪ জনের ৯৯ শতাংশের নাম বাদ যাওয়ার বাস্তব ভিত্তি ছিল না। এই পরিসংখ্যান ধরলে, ২৭ লক্ষ বাতিলের মধ্যে কতজনকে ‘অন্যায়ভাবে’ বাদ দেওয়া হয়েছে, তা বুঝতে আলাদা অঙ্ক কষার দরকার হয় না। বৈধ নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও ভোটাধিকার থেকে বঞ্চনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ঘোর উলঙ্ঘন।
নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর (এসআইআর) সৌজন্যে সেই উলঙ্ঘন ঘটেছে। তৃতীয়ত, এসআইআর-এ বাতিলদের ট্রাইবিউনােল আবেদন ও বিচারের জন্য যে সময় দেওয়া হয়েছে, তা যে কত অকিঞ্চিৎকর, তা ওপরের পরিসংখ্যানে প্রমাণিত। চতুর্থত, দলে দলে লোক বুথের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছেন এবং ৯২ শতাংশের বেশি ভোটের হার মানে কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচন নয়।
বুথে যত কড়াকড়ি থাক, এলাকায় যতই আধােসনার টহলদারি থাকুক, কিছু কিছু এলাকায় রাজ্যের শাসকদলের স্বভাবসুলভ দাদাগিরি ঠেকানো যায়নি। তার বাহ্যিক প্রকাশ তেমন নেই ঠিকই। কারণ কমিশনের যেমন বুনো ওল, তৃণমূলের তেমনই বাঘা তেঁতুল মজুত। উত্তরপ্রদেশের অজয় পাল শর্মাকে পুলিশ পর্যবেক্ষক করে নির্বাচন কমিশন দক্ষিণ ২৪ পরগনাকে দুর্গ বানিয়ে ফেললেও নির্বিকারভাবে ভোেটর দিন দলীয় দপ্তরে বসে নীরবে তৃণমূলের চিরাচরিত অপারেশন করে যেতে ফলতার জাহাঙ্গির খানের অসুবিধা হয়নি।
এই তথ্যের প্রাসঙ্গিতা স্পষ্ট ভোটগ্রহণ শুরুর চার ঘণ্টার মধ্যে বিজেপি ফলতায় পুনর্নির্বাচন দাবি করায়। ভবানীপুরে জয় বাংলা ও চোর চোর ধ্বনি দিয়ে শুভেন্দু অধিকারীকে প্ররোচিত করা ও নির্দিষ্ট একটি এলাকায় দীর্ঘক্ষণ পড়ে থাকার পিছনেও ছিল সুষ্ঠু পরিকল্পনা। বিশেষ করে দক্ষিণবঙ্গে পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বিস্তীর্ণ অংশে এধরনের নানা পরিকল্পনা কার্যকর করেছে তৃণমূল।
নির্বাচন কমিশনের নজরদারি, মেশিনারি ওইসব পরিকল্পনাকে ধরতে পারেনি। কমিশন ও আধাসেনা নির্ভর বিজেপিও সেইসব পরিকল্পনাকে টেক্কা দিতে পারেনি সব জায়গায়। সেই পরিকল্পনাগুলি কার্যকর হওয়ায় নির্বাচনকে কি আর সুষ্ঠু বলে ছাড়পত্র দেওয়া যায়? হিংসা শুধু নয়, নানা ধরনের চালবাজি, কুমতলব বাংলার নির্বাচনের অংশ হয়ে আছে। হিংসাকে এড়ালেও ওই বদঅভ্যাসগুলি বদলায়নি। যা সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়।
