অমিত দে
শীতের শুরু থেকেই ছোট-বড় বিভিন্ন জেলায় চলছে বাঙালির অন্যতম পার্বণ বইমেলা (E-book Honest 2026)। কলকাতা বইমেলা বাদ দিলে প্রান্তিক বা জেলা শহরে এই বইমেলা পার্বণের পর্যায়ে আর রয়েছে কি না সে প্রশ্ন একেবারে অবান্তর নয়। তবুও মেলা, উৎসব, আহার, গান এই সবকিছুকে ছাপিয়ে শুধু বইকে কেন্দ্র করে যে আলোড়ন তার গুরুত্ব এখনও সমপর্যায়ে রয়ে গিয়েছে। লেখক, সচেতন মনস্বী পাঠক বাদে এই মেলাতেই প্রথম বইয়ের নেশাতে ডুব দেওয়ার সুযোগ পায় অজস্র অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে। সারা বছরের সিলেবাস ভিত্তিক লেখাপড়ার বাইরে নিজের অজান্তেই আবিষ্কার করে এক অচেনা আনন্দ-ভুবন। সেই ক্ষেত্রে এই বইমেলার ভূমিকা অদ্বিতীয়। আগে যে ভূমিকা ছিল লাইব্রেরির। কিন্তু বর্তমানে সরকারি বা বেসরকারি লাইব্রেরিগুলো কীভাবে নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য অন্তিম লড়াই করছে তা আমরা জানি।
ধুলো জমা আলমারি বনাম অনাদরের শৈশব
শহরের স্কুলগুলো নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের অথবা সচেতন অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানদের যেভাবে এই বইমেলায় অংশগ্রহণ করায় তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বৃহত্তর পরিসর নিয়ে। বইমেলার ঢেউ এখানে এসে পৌঁছায় না। গ্রামগঞ্জের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই সুযোগ কোথায়! অনেক স্কুলে লাইব্রেরিই নেই, কিছু স্কুলে থাকলেও তা নামমাত্র পরিকাঠামোতে নিজ অস্তিত্ব জানান দেওয়ার মতোও নয়। বই আছে তো লাইব্রেরিয়ান নেই, আবার কোথাও পর্যাপ্ত বই নেই। কোথাও বই থাকলেও প্রশস্ত ঘর নেই। বই দীর্ঘদিন আলমারি বন্দি হয়ে কচিকাঁচা হৃদয়ের সঙ্গে নয়, ধুলোর সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছে।
একটি বই ও বদলে যাওয়া জীবনের স্বপ্ন
সেখানে সর্বস্তরের সমস্ত স্কুলে (College) বছরে একবার হলেও যদি ছোট-বড় আকারে বই উৎসব করা যায় তা খুব কষ্টসাধ্য কাজ হবে কি? বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সরস্বতীপুজো, খাদ্য উৎসব এইসবের মাঝে একটি বই উৎসব কি ওই কচিকাঁচা হদয়ে কিছুটা হলেও বইয়ের প্রতি আলাদা উৎসাহ, আলাদা ভালোবাসা জাগাবে না? দরকার তো একটু আলোর দিশা দেখানো। সকলে বই কিনবে না, হয়তো আর্থিকভাবে খুব একটা লাভবান হওয়া যাবে না। কিন্তু যে ছেলে বা মেয়েটি নিতান্তই সামান্য আগ্রহে একটি কমিকসের চটি বই তুলে নিয়ে গেল, আগামীদিনেই ‘হাঁদাভোঁদা-বাঁটুল’ হয়ে ‘অর্জুন-ঋভু’ হয়ে সে যে একদিন ‘পথের পাঁচালী’, ‘সেই সময়’, ‘কেয়াপাতার নৌকা’ হাতে তুলে নেবে না তা কে জানে! যে ছাত্রটির হাতে চলে এল কোডিং-এর বই সে যে ভবিষ্যতে নিজেই কিছু করে ফেলবে না তা হয়তো ছেলেটি নিজেও জানে না। পড়াশোনায় চূড়ান্ত অমনোযোগী এক কিশোরীর একটি সার্থক পাঠ তাকে দিয়েও একদিন লেখাতে পারে কবিতার কয়েক পংক্তি। একটি প্রথম ভালোলাগা বই যে কী করে ফেলতে পারে তা একজন প্রকৃত পাঠক অথবা একজন লেখক মাত্রেই জানেন।
সদিচ্ছা ও যৌথ উদ্যোগে উৎসবের রূপরেখা
এরকম ভাবনা বা সদিচ্ছা আদৌ আমাদের রয়েছে কি না সেটাই বড় প্রশ্ন। শুধুমাত্র প্রশাসনিক নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে স্কুলগুলি নিজস্ব উদ্যোগেও শুরু করতে পারে বই উৎসব। এককভাবে সম্ভব না হলে পার্শ্ববর্তী কয়েকটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক স্কুল মিলে অগ্রণী হলে এই উদ্যোগ আরও সফলতা পাবে। সিলেবাসের বইয়ের সূত্রে স্কুলে সারাবছর বিভিন্ন প্রকাশনার কর্মীদের আনাগোনা লেগেই থাকে, তাদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। স্থানীয় বইয়ের বিপণিগুলোকে যুক্ত করতে হবে। আর যদি কাছাকাছি কোনও লাইব্রেরি থাকে শুধুমাত্র প্রদর্শনীর জন্য বই নেড়েঘেঁটে দেখার জন্য সেটিকেও যুক্ত করা যেতে পারে। তবেই সবমিলিয়ে যথার্থ অর্থেই হয়ে উঠবে বই উৎসব।
(লেখক শিক্ষক ও সাহিত্যিক)
