সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর: মারণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাড়ি অবশেষে সরছে। দীর্ঘ টালবাহানা, একের পর এক দুর্ঘটনা আর সাধারণ মানুষের পাহাড়প্রমাণ অভিযোগের পর অবশেষে টনক নড়ল প্রশাসনের। মালদার (Malda) হরিশ্চন্দ্রপুর-চাঁচল ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কের (NH 31) রাড়িয়াল এলাকায় সড়কের মাঝখানে থাকা সেই ‘অভিশপ্ত’ দোতলা বাড়িটি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু করল জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ ও বাড়ির মালিক। সেই বাড়ির জন্য সেখানে থমকে ছিল জাতীয় সড়ক নির্মাণের কাজ। এবার অবিলম্বে তা শুরু হবে বলে জানিয়েছে মালদা ন্যাশনাল হাইওয়ে ডিভিশন।
মালদা ন্যাশনাল হাইওয়ে ডিভিশনের এগজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার দিগন্ত কুণ্ডু আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন, বাড়ির জন্য ওই এলাকায় কাজ বন্ধ ছিল। বাকি সব জায়গায় কাজ শেষ। বাড়ির মালিককে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। বাড়ি ভাঙার কাজ চলছে, দ্রুত রাস্তা নির্মাণের কাজও শুরু হয়ে যাবে।
২০১৭ সালে এখানে জাতীয় সড়কের কাজ শুরু হয়েছিল। হরিশ্চন্দ্রপুর (Harishchandrapur) হয়ে এই রাস্তাটি বিহার এবং পরবর্তীতে উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। সড়ক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বছর দেড়েক আগেই হরিশ্চন্দ্রপুর ও চাঁচলের মধ্যে থাকা সিংহভাগ কাজ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রাড়িয়াল গ্রামের কাছে এসে থমকে যায় কাজ। কারণ রাস্তার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটি দোতলা বাড়ি। রাস্তা বানাতে তো জমি অধিগ্রহণ করতে হয়। সেই জমি এবং বাড়ির ক্ষতিপূরণ নিয়ে জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাড়ির মালিকের মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ঠিক হলেও তা হাতে পেতে আবার দেরি হয়। সেজন্য তিনি বাড়ি ছাড়েননি। আর কাজও হয়নি। বাড়ির মালিক আরব আলির সাফ কথা, ‘ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটি সমস্যা তৈরি হয়েছিল, তাই বাড়িটি ভাঙা হয়নি। এখন ক্ষতিপূরণ পেয়ে গিয়েছি, তাই বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে।’
আর এই প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মাশুল দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। রাস্তার মাঝে আড়াআড়িভাবে বাড়িটি দাঁড়িয়ে থাকায় ওই এলাকায় হামেশাই দুর্ঘটনা ঘটত। তাতে প্রাণহানিও হয়েছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে গভীর রাতে চাঁচল হাসপাতালে রোগী পৌঁছে দিয়ে ফেরার একটি অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই বাড়ির দেওয়ালে গিয়ে সোজা ধাক্কা মারে। মৃত্যু হয় চালকের। এর আগেও বহু গাড়ি ওই দেওয়ালে ধাক্কা মেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এতদিন পর দুর্ঘটনার সেই আশঙ্কা কাটায় খুশির হাওয়া এলাকায়। প্রতিদিন এই পথে যাতায়াত করেন গাড়িচালক মজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গাড়ি নিয়ে চাঁচল-হরিশ্চন্দ্রপুর যাতায়াত করি। এই জাতীয় সড়কে হাজার হাজার গাড়ি চলে। এই এলাকায় এসে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা খুব সমস্যাজনক। বিশেষ করে রাতে এই জায়গা দিয়ে খুব সাবধানে গাড়ি নিয়ে যেতে হত। এখন শুনছি বাড়িটা ভেঙে ফেলা হবে। দেরিতে হলেও কর্তৃপক্ষের বোধোদয় হল।’ নিত্যযাত্রী রুহুল আমিন তাঁর আতঙ্ক মেশানো অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়ে বলেন, ‘প্রতিদিন রাতে মোটরসাইকেলে করে চাঁচল থেকে ফিরতে হয়। এই এলাকায় রাস্তার মাঝে বাড়ি থাকায় মাঝেমধ্যেই দুর্ঘটনা চোখের সামনে দেখতে পেতাম।’
এলাকাবাসীর স্বস্তির আরেকটা কারণ হল, এবার সড়কের কাজ শেষ হবে। হরিশ্চন্দ্রপুর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডাবলু রজক বলেন, ‘বাড়িটি রাস্তার মাঝে থাকায় রাস্তার কাজ শেষ করা যাচ্ছিল না। এই নিয়ে আমরা একাধিকবার জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয়েছিলাম। অবশেষে কাজ শুরু হচ্ছে জেনে ভালো লাগল।’
