Malda | জলমগ্ন ভূতনির অন্ধকারে স্পিডবোটে জন্ম নিল নতুন প্রাণ, নাম রাখা হল ‘প্লাবন’

ব্যবসা-বাণিজ্যের /BUSINESS
Spread the love


আজাদ, মানিকচক: তার নাম প্লাবন। জন্মের আগেই যেন নামটি নিজের হাতে লিখে ফেলেছিল সময়। চারদিকে তখন প্লাবনের জল। ঘরবাড়ি ডুবে গিয়েছে, রাস্তা হারিয়েছে। সেই জলের মাঝেই বাড়ির ছাদে মাচা করে আশ্রয় নিয়েছিলেন জুলেখা। গভীর রাতে উঠল প্রসববেদনা। আর তারপর কালো জল চিরে ছুটল সিভিল ডিফেন্সের স্পিডবোট— একটি নতুন প্রাণের দিকে।

গত দু’সপ্তাহ ধরে বন্যার জলে ভাসছে মালদার (Malda) ভূতনি (Bhutni)। লোকালয়ে থইথই জল। গত ১০ দিন ধরে মানিকচকের সঙ্গে ভূতনির তিনটি অঞ্চলের যোগাযোগকারী রাস্তাগুলিও জলের তলায়। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেই গত সোমবার রাতে আটশুইয়া গ্রামের গৃহবধূ জুলেখা বিবির প্রসবযন্ত্রণা শুরু হয়। মুহূর্তে দিশেহারা হয়ে পড়েন পরিবারের লোকজন। খবর যায় স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকদের কাছে। খবর পেয়েই প্রতিকূল জলপথ পেরিয়ে আটশুইয়ায় পৌঁছান সিভিল ডিফেন্সের দুই আধিকারিক সৌরভ দত্ত, রাহুল বিশ্বাস সহ অন্য কর্মীরা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজেদের স্পিড বোটে জুলেখাকে উদ্ধার করে তাঁরা রওনা দেন মানিকচক গ্রামীণ হাসপাতালের দিকে।

বাইরে তখন শুধু জল, অন্ধকার আর অনিশ্চয়তা। সেই জল পেরিয়েই সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছান জুলেখা। চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে জন্ম নেয় এক পুত্রসন্তান। হাসপাতালের আলোয় পৃথিবী দেখে ছোট্ট শিশুটি। ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীরা তার নাম দেন ‘প্লাবন’। থইথই জলের মধ্যে ভূমিষ্ঠ হয়েছে যে শিশু, তার এর চেয়ে যথার্থ নাম আর কীই-বা হতে পারে! ছেলের নামটা শুনে খুশি মা জুলেখাও।

বন্যার জেরে ভূতনির উত্তর চণ্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের আটশুইয়া সহ বিস্তীর্ণ এলাকা জলের তলায় চলে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে উদ্যোগ নেয় প্রশাসন। প্রায় ৩৫১ জন গর্ভবতীকে মথুরাপুর ফ্লাড শেলটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেককে ভর্তি করা হয়েছে মানিকচক গ্রামীণ হাসপাতালে। কিন্তু জুলেখা যেতে চাননি।

দেড় বছর আগে মানিকচকের জালালপুর গ্রামের মহম্মদ রবিউলের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। গর্ভবতী অবস্থায় গত দু’মাস ধরে বাপের বাড়ি আটশুইয়াতেই ছিলেন তিনি। বন্যার জল বাড়তে শুরু করলেও বাপের বাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি হননি। আশাকর্মী ও স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্মীরা তাঁকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যেতে এসেছিলেন। কিন্তু জুলেখার সিদ্ধান্ত ছিল, বাড়িতেই থাকবেন। জল শেষপর্যন্ত তাঁর বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। তবু পরিস্থিতি সামলে নেওয়া যাচ্ছিল। সোমবার রাতের প্রসববেদনা সেই হিসাব বদলে দেয়। পরিবারের লোকজন তখন দিশেহারা। খবর পৌঁছায় প্রশাসনের কাছে। স্পিড বোটে চেপে জুলেখা যখন হাসপাতালমুখী, তখন বিধাতা ছোট্ট প্লাবনের পৃথিবীতে আসার কাহিনী লিখতে শুরু করেছেন।

হাসপাতালে তিনদিন ছিলেন জুলেখা। কোলে নবজাতক প্লাবন। এর মধ্যে গত দু’দিন ধরে ভূতনিতে বন্যার জল কিছুটা কমেছে। জুলেখার বাপের বাড়ির ভেতর থেকেও জল নেমেছে। তাই আবার বাড়ি ফিরতে চান তিনি। বৃহস্পতিবার দুপুরে সেই ইচ্ছাও পূরণ হল। ছোট্ট প্লাবনকে কোলে নিয়ে ফের সিভিল ডিফেন্সের স্পিড বোটে চেপে আটশুইয়ার বাপের বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলেন জুলেখা।

তখন তাঁর মুখে স্বস্তি। সিভিল ডিফেন্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও। জুলেখা বলেন, ‘নার্সদিদি ও ডাক্তারবাবুরা আমার ছেলের নাম রেখেছেন প্লাবন। প্রশাসনের লোকজন খুব সাহায্য করেছে। এরকম পরিস্থিতিতে প্রশাসনের সাহায্য না পেলে যে কী হত, ভাবতেই ভয় লাগছে।’ মালদা সদরের এসিএমওএইচ হেমনারায়ণ ঝা বলেন, ‘প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের এমন ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়।’

ভূতনির জল এখনও পুরোপুরি সরে যায়নি। অনেক রাস্তা এখনও জলের নীচে। বহু বাড়ির চারপাশে এখনও সেই কালো জল। তারই মধ্যে প্লাবনের নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকল বানভাসির স্মৃতি, অন্ধকার রাত, পরিবারের উৎকণ্ঠা, সিভিল ডিফেন্সের স্পিড বোট, হাসপাতালের আলো— সবই।

জলস্রোত যেমন অনেককিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তেমনই কখনো-কখনো সেই জলের মধ্যেই নতুন কোনও গল্পের জন্মও তো নেয়।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *