মালদা: মালদার (Malda) ইংরেজবাজার থানা এলাকায় একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কাস্টমার সার্ভিস পয়েন্ট (সিএসপির)-এর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের প্রায় চার কোটি টাকা হাতানোর অভিযোগ উঠল। দীর্ঘদিন ধরে এই কাণ্ড চলেছে কাজিগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার নিত্যানন্দপুরের সেই সিএসপি (CSP)-তে। বিষয়টি সামনে আসতেই যখন গ্রাহকরা টাকা ফেরতের দাবি নিয়ে সেই সিএসপি’র সামনে জড়ো হন, তখন দেখেন দরজায় তালা। সত্যজিৎ দাস নামের ব্যক্তি, যিনি সেই সিএসপি চালাতেন, তিনিও উধাও।
কখনও লিংক না থাকার অজুহাতে একাধিকবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়ে কখনও ভুয়ো সফটওয়্যার ব্যবহার করে ভুল পাসবুক প্রিন্ট করে কয়েক কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ উঠেছে সেই সত্যজিতের বিরুদ্ধে। ঘটনার প্রতিবাদে ও টাকা ফেরতের দাবিতে বুধবার সকালে প্রথমে ওই সিএসপি’র সামনে ও পরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মেইন ব্রাঞ্চে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন উপভোক্তারা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় ইংরেজবাজার থানার পুলিশ। অভিযোগের ভিত্তিতে উপযুক্ত পদক্ষেপ করার আশ্বাস দিয়েছেন ব্যাংকের ম্যানেজার।
উপভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সত্যজিৎ ওই এলাকারই বাসিন্দা। তাঁর সিএসপি রমরমিয়ে চলত। সেখানে ব্যাংকের প্রায় ৩০ হাজার উপভোক্তা টাকার লেনদেন করতেন। গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে এক উপভোক্তা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানান যে, তিনি মাস দুয়েক আগে ৪ লক্ষ টাকা ফিক্সড ডিপোজিটের জন্য দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকা আর জমা দেওয়া হয়নি। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ওই সিএসপি-তে অভিযান চালায়। অভিযানে বেশ কিছু অসংগতি নজরে আসে কর্তৃপক্ষের। তখনও কিন্তু এলাকায় ছিলেন সত্যজিৎ। দু’দিনের মধ্যে অভিযোগকারীর টাকা ফিক্সড করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। কিন্তু তা না করায় গত ২৭ মে ওই সিএসপি’র অ্যাকাউন্ট হোল্ড করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের কাছে আরও অভিযোগ আসতে শুরু করে। অবশেষে গত ৮ জুন ওই সিএসপি অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি ফ্রিজ করে দেওয়া হয়। অভিযোগ, তার কিছুদিন পর থেকেই উধাও হয়ে যান ওই সিএসপি’র মালিক। অভিযোগের তদন্তে নেমে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, ওই সিএসপি থেকে প্রিন্ট করে দেওয়া পাসবুকের সঙ্গে ব্যাংকের রেকর্ডের প্রচুর গরমিল রয়েছে। প্রাথমিকভাবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অনুমান, কোনও ভুয়ো সফটওয়্যার ব্যবহার করেই এই প্রতারণা চালানো হয়েছে।
এক উপভোক্তা পুচি রজক বলেন, ‘আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ লক্ষ ৫ হাজার টাকা ছিল। টাকা তুলতে গেলে ওই সিএসপি’র মালিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে বলত। আমি ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার পর আমাকে বারবার হয়রান করত। হয় বলত ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিচ্ছে না, অথবা বলত লিংক নেই। আবার ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে বলত। কিন্তু আমরা টাকা তুলতে পারিনি। পরে জানতে পারি আমার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।’ আরেক উপভোক্তা ধীরেন্দ্রনাথ দে’র কথায়, ‘এই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কাস্টমার সার্ভিস পয়েন্ট থেকে আমরা টাকার লেনদেন করতাম। গত দুই মাস ধরে সিএসপি মালিক আমাকে ব্যাংকের পাসবুক দিচ্ছে না, টাকা তুলতে দিচ্ছে না। আমার অ্যাকাউন্ট থেকে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমার স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকেও অনেক টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। আমাদের স্বামী-স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১ লক্ষ টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।’
উপভোক্তাদের আরও অভিযোগ, গরমিল জানাজানি হওয়ার পর থেকেই ওই সিএসপি মালিক বাড়ি থেকে ছেড়ে পালিয়েছেন। তাঁদের কারও ফোনও ধরছেন না। ব্যাংক ম্যানেজার অবশ্য তাঁদের সবাইকে অভিযোগ জমা দিতে বলেছেন। সেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ম্যানেজার প্রবীণ কুমার বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে ওই সিএসপি’র বিরুদ্ধে আমাদের কাছে অভিযোগ জমা পড়ছে। আজও অনেক গ্রাহক ব্যাংকে এসে নিজেদের অভিযোগ জানিয়েছেন। মোট কত টাকার জালিয়াতির অভিযোগ তা আমরা খতিয়ে দেখছি। আমাদের একটি স্পেশাল টিম তদন্ত করছে।’

