বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি: ৭০০-রও বেশি রোগীর ভিড়, অথচ চিকিৎসক মাত্র দুজন! এমন ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে চরম হয়রানির শিকার হলেন রোগীরা। প্রখর রোদ ও অসহ্য গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর, চিকিৎসা না করিয়েই বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হলেন শতাধিক মানুষ। বুধবার ময়নাগুড়ি গ্রামীণ হাসপাতালে (Mainaguri Hospital Disaster) এমনই চরম অব্যবস্থার ছবি ধরা পড়ল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, বহির্বিভাগে সাধারণত প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৪৫০ জন রোগী আসেন। কিন্তু প্রতি মাসের ৮ ও ১৯ তারিখ প্রসূতি ও অন্তঃসত্ত্বাদের স্পেশাল চেকআপ থাকায় আরও অন্তত আড়াইশো রোগীর চাপ বাড়ে। দুপুর গড়াতেই টিকিট কাউন্টারে নথিভুক্ত রোগীর সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে যায়। অথচ, এই বিপুল চাপ সামলাতে বহির্বিভাগে ছিলেন মাত্র দুজন চিকিৎসক। তাঁদের মধ্যে একজন শুধুমাত্র প্রসূতিদের দেখছিলেন এবং অন্যজন বাকি সমস্ত সাধারণ রোগী দেখার দায়িত্বে ছিলেন। ফলে টিকিট কাউন্টার থেকে শুরু করে ডাক্তার দেখানো ও ওষুধ নেওয়ার লাইন হাসপাতালের বাইরে পর্যন্ত চলে যায়।
এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন রোগীরা। মাধবডাঙ্গা-১ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার গোলাপি রায় তাঁর সাত বছরের জ্বরে আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে সকাল সাড়ে দশটায় এসেছিলেন। দুপুর পৌনে একটা নাগাদ হাল ছেড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘অসুস্থ শিশুকে নিয়ে কতক্ষণ এভাবে রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব? লাইন একটুও এগোচ্ছে না, তাই বাধ্য হয়েই বাড়ি ফিরছি।’ একই অভিজ্ঞতা আমগুড়ির বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ রায়ের। কয়েকদিন ধরে বুকে ব্যথা হওয়ায় তিনি এসেছিলেন। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার উপক্রম হওয়ায় তিনিও চিকিৎসা না করিয়েই ফিরে যান। তাঁর ক্ষোভ, ‘আর দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব, লাইনেই অসুস্থ হয়ে পড়ব।’
প্রসূতি ও অন্তঃসত্ত্বাদের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। আমগুড়ি চাপগড়ের পদ্মা সরকার মণ্ডল, টেকাটুলির সাবিত্রী দাস কিংবা রামশাই চ্যাংমারির প্রতিমা রায়— সকলেই এদিন স্পেশাল চেকআপের জন্য এসে চরম দুর্ভোগে পড়েন। টিকিট কেটে তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর ক্ষুব্ধ সাবিত্রী ও প্রতিমা জানান, কড়া রোদে এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা তাঁদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। পদ্মার কথায়, ‘এখানে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে নির্ঘাত মারা যাব।’
খাগড়াবাড়ি-২ অঞ্চলের বিজেপির মণ্ডল সভাপতি সুধীর দাসও এদিন জ্বর-সর্দি নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। দুপুর দুটো পর্যন্ত ওষুধের লাইনে দাঁড়িয়ে ক্ষুব্ধ সুধীরবাবু বলেন, ‘প্রায় তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এই ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা দলের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত জানাব।’
চিকিৎসকের এই অভাব প্রসঙ্গে ময়নাগুড়ি গ্রামীণ হাসপাতালের বিএমওএইচ ডাঃ সীতেশ বর জানান, হাসপাতালে মোট সাতজন চিকিৎসকের ডিউটি সেটআপ থাকে, যার মধ্যে তিনজনের ওপিডিতে থাকার কথা। কিন্তু এদিন সকালে ওপিডিতে আসার ঠিক মুখেই এক চিকিৎসক হঠাৎ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়ায় এই সমস্যা তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে পরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে একজন চিকিৎসককে আনা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘রোগীদের ফিরে যাওয়ার খবর আমি পাইনি, তবে এমনটা হয়ে থাকলে তা একেবারেই কাম্য নয়।’
বিএমওএইচ আরও জানান, স্পেশাল চেকআপের দিনগুলোতে রোগীর সংখ্যা ৭৫০ ছাড়িয়ে যায়। পুরোনো বহির্বিভাগে বসার জায়গা বা পাখা থাকলেও বর্তমান রোগীর তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তাই পরিকাঠামোগত এই চাপ সামলাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ইতিমধ্যেই একটি ‘স্মার্ট ওপিডি’ নির্মাণের লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

