ময়নাগুড়ির টাউন হোটেল নিয়ে প্রবীণদের ঝুলিতে রয়েছে অনেক গল্প। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই হোটেলের জায়গায় মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে মাল্টিন্যাশনাল বিল্ডিং। নতুন প্রজন্ম এর গল্প না জানলেও প্রবীণদের স্মৃতিতে আজও টাটকা টাউন হোটেল মোড়।
বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি: ১৯৬২ সালের ঐতিহ্যবাহী ‘টাউন হোটেল’-এর নাম শোনেননি এমন প্রবীণ ময়নাগুড়িতে (Mainaguri) খুঁজে পাওয়া যাবে না। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা টাউন হোটেলের সঙ্গে তেমন পরিচিত না হলেও প্রবীণদের স্মৃতির ক্যানভাসে আজও উজ্জ্বল এই হোটেল। এখনকার ব্যস্ত ট্রাফিক মোড় (Mainaguri Visitors Extra) একসময় এই হোটেলের নামেই অর্থাৎ টাউন হোটেল মোড় (City Resort Extra) নামে পরিচিত ছিল। এখন হোটেলটি আর নেই, তবে প্রবীণরা আজও টোটো বা রিকশায় ওঠার সময় ‘টাউন হোটেল মোড়’ বলেই সম্বোধন করেন।
৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অমল রায়ের কথায়, ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর নাম টাউন হোটেল মোড়। অপেক্ষা করে থাকা কিংবা বৃষ্টি থেকে বাঁচতে দাঁড়িয়ে থাকার আদর্শ জায়গা ছিল হোটেলটি। মালিকের ব্যবহার ছিল অতুলনীয়। যেন মনে হত হোটেল মালিক অত্যন্ত নিকটাত্মীয়। এখন সবটাই স্মৃতি।’ এখন ওই হোটেলের জায়গায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে মাল্টিন্যাশনাল বিল্ডিং।
প্রয়াত গোপাল গোপের টাউন হোটেল ছিল ট্রাফিক মোড়েই। ষাট-সত্তরের দশকে দু’টাকায় যাঁরা মাছ-ভাত ও ডিম-ভাত খেয়েছেন তাঁদের আজও সেই সব দিনের কথা স্পষ্ট মনে রয়েছে। তখন এখানে গোপ পরিবারের কাঠের দ্বিতল ভবন ছিল। ওপরে কয়েকটি ঘরে থাকার বন্দোবস্ত ছিল। গ্রাউন্ড ফ্লোরেই ছিল হোটেল। সবমিলিয়ে সেই সময় এই মোড়ে পাঁচ-ছয়টি দোকানপাট ছিল। শহরের গণ্যমান্যরা টাউন হোটেলেই আড্ডা জমাতেন। এটা শহরের অন্যতম আড্ডার জায়গা ছিল। আশপাশে রয়েছে বিরিয়ানির দোকান সহ বিভিন্ন সামগ্রীর অসংখ্য দোকানপাট।
মহাকালপাড়ার বাসিন্দা গোপালবাবুর মৃত্যু হয় ১৮৮৯ সালে। মেজো ছেলে গৌরাঙ্গ গোপ টেনেহিঁচড়ে ২০১০ সাল পর্যন্ত সেই হোটেল চালান। এখন নামটা থাকলেও হোটেলের চিহ্ন নেই। গৌরাঙ্গর কথায়, ‘হোটেলের আগে এখানে বাবার কাপড়ের দোকান জনতা ভাণ্ডার ছিল। তারপর হল টাউন হোটেল। এখন মাল্টিন্যাশনাল বিল্ডিং মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।’
কমার্সিয়াল হোটেল হলেও সেই আমলেই জনসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন গোপালবাবু। থাকা এবং খাওয়ার টাকা ছিল খুবই কম। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত রেলকর্মী প্রদীপ দেবগুপ্ত বলেন, ‘সেই আমলে জনপ্রিয় একমাত্র ময়নাগুড়ির হোটেল ছিল এটাই। বহুবার ওই হোটেলে খেয়েছি। খুব বেশি দাম নিতেন না। আশপাশে হাতেগোনা কয়েকটি দোকানপাট ছিল। এখন সবটাই অতীত, স্মৃতির ক্যানভাসে আঁকা। শুধু নামটাই আছে লোকমুখে।’ পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান সোমেশ সান্যালের কথায়, ‘বিষয়টি সবটাই জানা। শেষের দিকটায় আমরা বেশকিছুটা দেখেছি। নামের সঙ্গে কাহিনীর অসাধারণ মেলবন্ধন রয়েছে।’
এখন ট্রাফিক মোড়ে গেলে ওদিকটায় একবার তাকাতেই হয় বলে জানালেন অবসরপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক স্বপন দাস। বললেন, ‘ওই হোটেলে বহুবার খেয়েছি। গুণীজনদের আড্ডা জমত ওখানে। তাঁর কথায় সায় জানিয়ে ব্যবসায়ী মনোতোষ গোপ বলেন, ‘আমার জেঠু ছিলেন গোপাল গোপ। সেই সময় মাঝেমধ্যেই জেঠুর হোটেলে গিয়ে বসতাম। বহু মানুষ আসতেন হোটেলে। চলত খাওয়াদাওয়া আর জমিয়ে আড্ডা দেওয়া।’
৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার গোবিন্দ পাল বলছিলেন, ‘টাউন হোটেল মোড় নামটাই একটা বড় ইতিহাস।’ যদিও টাউন হোটেল মোড়ের নাম জানলেও ইতিহাস জানা নেই বলে জানালেন ১১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কলেজ পড়ুয়া নারায়ণ রায়।
