ধর্মের কল

ধর্মের কল

শিক্ষা
Spread the love


পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোট বরাবরই সরকার গড়ার অন্যতম প্রধান সোপান। রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় কংগ্রেসের হাত শক্ত করেছে। পরে সেই ভোটব্যাংকের দখল নিয়েছিল বামফ্রন্ট। ২০১১ সালের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সময় রাজ্যের সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের সমর্থন চলে যায় তৃণমূলের অনুকূলে। তারপর থেকে গত ১৫ বছর ধরে এই ভোটব্যাংক আর তৃণমূল হাত ধরাধরি করে চলেছে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে সেই সাজানো সমীকরণে ফাটল ধরার ইঙ্গিত মিলছে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ তুলে হিন্দুত্বের রাজনীতির রাস্তা চওড়া করেছে বিজেপি। স্বাধীনতা উত্তর পশ্চিমবঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসরের দখল অনেকটাই এখন ধর্মীয় মেরুকরণের হাতে।

ভোটারদের একাংশের মধ্যে তার প্রভাব দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। অবশ্য সারাদেশেই এখন হিন্দুত্বের উগ্র আস্ফালন। সেই প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে বিরোধী শিবিরও নরম হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরছে। যারা নিজেদের দেশের সবথেকে বড় বামপন্থী দল বলে দাবি করে, সেই দলের প্রার্থীরাও ইদানীং মন্দিরে পুজো দিচ্ছেন, যজ্ঞে ঘৃতাহুতি দিচ্ছেন আবার ইফতার পালন করছেন দিব্যি।

ফলে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধির মতো মানুষের মৌলিক বিষয়গুলি ভোটের ইস্তাহারপত্রেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। মিটিং, মিছিলে সেসবের উল্লেখ হলেও নামমাত্র। আমজনতার কানে সেসব কথার জোরালো আবেদন পৌঁছাচ্ছে না। বদলে বাংলার ভোটে সংখ্যালঘুদের সমর্থন কোন দিকে যাবে, সেই বিষয়টিই অধিক প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে অন্তত ১১৪টিতে সংখ্যালঘু ভোটারের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে। আইএসএফ বিধায়ক নৌশাদ সিদ্দিকী অভিযোগ করছেন, সংখ্যালঘুদের কেবল নির্বাচনের সময় ‘দুধেল গাই’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তাঁদের প্রকৃত উন্নয়ন কিছুই করা হয়নি। অপরদিকে সংখ্যালঘুদের নতুন বিকল্প হিসেবে এআইমিম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসির সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে ভোটযুদ্ধে নামছেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির সুপ্রিমো হুমায়ুন কবীর।

হুমায়ুন-ওয়াইসি জোটের লক্ষ্য, রাজ্যের সংখ্যালঘু প্রধান আসনগুলোতে প্রার্থী দিয়ে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র আধিপত্যে ভাগ বসানো। হুমায়ুন-মিম-নৌশাদদের সংখ্যালঘু তাসের সামাল দেওয়া খুব সহজ নয় তৃণমূলের পক্ষে। বিজেপির হিন্দুত্বের দেখাদেখি সংখ্যালঘুদের নিজস্ব দলের ন্যারেটিভ হাওয়া পাচ্ছে বলে কপালে ভাঁজ পড়েছে ঘাসফুল শিবিরের। এতদিন যে নিরেট ৩০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটের ওপর ভর করে শাসকদল অনায়াসে বৈতরণি পার হত, এখন সেই ভোটব্যাংক বিভাজনের মুখে।

মালদা-মুর্শিদাবাদে পুরোনো জমি ফিরে পেতে কংগ্রেসও জোরকদমে প্রচার চালাচ্ছে। ফলে যেখানে একসময় লড়াই হত দ্বিমুখী বা বড়জোর ত্রিমুখী, সেখানে এখন সংখ্যালঘু প্রধান কেন্দ্রগুলোতে ভোট কাটাকাটির অঙ্ক বহুমাত্রিক। আর এই বহুধা বিভক্ত ভোট সমীকরণের ফসল কার ঘরে উঠবে সেটাই সবথেকে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, ধর্মীয় আবেগ ও মেরুকরণের আগ্রাসী ঢেউয়ের মোকাবিলায় ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি বড় দিশাহীন। ধর্মের আবেগ যখন চারদিকে ফণা তুলছে, তখন তৃণমূল হাতিয়ার করছে বাঙালি সংস্কৃতির আবেগকে। কিন্তু বাস্তবের রূঢ় জমিতে কেবল আবেগ বা সংস্কৃতির প্রলেপ দিয়ে মেরুকরণের তীব্র স্রোতকে ঠেকানো সম্ভব কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকে যাচ্ছে।



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *