উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: আগামী ২০ জুলাই থেকে শুরু হতে চলেছে সংসদের বাদল অধিবেশন। আর তার আগেই ভারতীয় রাজনীতির নজর এখন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (Lok Sabha Speaker Om Birla) দিকে। কারণ, দলত্যাগ বিরোধী আইনের (Anti-Defection Regulation) ইতিহাসে অন্যতম বড় এক আইনি জটিলতার রায় তিনি দিতে চলেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস (TMC) এবং শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে)-র বিদ্রোহী সাংসদদের সাংসদ পদ খারিজের দাবি এবং অন্য দলে সংযুক্তির বিষয় নিয়ে স্পিকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রহর গুনছে রাজনৈতিক মহল।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে ২৯ জন সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর মধ্যে একজন সাংসদের প্রয়াণে একটি আসন বর্তমানে শূন্য। তবে চমকপ্রদভাবে, অবশিষ্ট ২৮ জনের মধ্যে ২০ জন সাংসদই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ছেড়ে হাওড়া-ভিত্তিক একটি প্রায় অচেনা এবং অস্বীকৃত রাজনৈতিক দল ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (Nationalist Residents Occasion of India – NCPI)-তে যোগ দিয়েছেন।
বিদ্রোহী এই সাংসদরা লোকসভায় আলাদা বসার জায়গা চেয়েছেন এবং নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA) সরকারের প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তৃণমূলের তরফ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন মূল দল এই ২০ জনের বিরুদ্ধেই দশম তফসিলের (Tenth Schedule) অধীনে সাংসদ পদ খারিজের জন্য পৃথক পিটিশন জমা দিয়েছে। তৃণমূলের যুক্তি, শুধুমাত্র কয়েকজন বিধায়ক বা সাংসদ বেরিয়ে গেলেই তাঁরা সংযুক্তির বা ‘মার্জার’-এর আইনি সুরক্ষা পেতে পারেন না।
একই ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা (ইউবিটি) (Shiv Sena UBT)। লোকসভায় তাদের ৯ জন সাংসদের মধ্যে ৬ জনই উদ্ধব ঠাকরের শিবির ছেড়ে মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের (Eknath Shinde faction) নেতৃত্বাধীন শিবসেনায় যোগ দিয়েছেন। উদ্ধব শিবিরও স্পিকারের কাছে দলত্যাগ বিরোধী আইনে এই ৬ জনের সাংসদ পদ বাতিলের কড়া দাবি জানিয়েছে। তাদেরও একই দাবি, দলের মূল সংগঠনকে পাশ কাটিয়ে আইনসভার একটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের মূল দল বলে দাবি করতে পারে না।
স্পিকারের মূল বিচার্য বিষয় হতে চলেছে দলত্যাগ বিরোধী আইনের ‘দুই-তৃতীয়াংশের নিয়ম’ (two-thirds majority rule)। মূল দলগুলোর দাবি, সংবিধান অনুযায়ী দলত্যাগের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা পেতে গেলে শুধুমাত্র আইনসভার (সাংসদ বা বিধায়ক) দুই-তৃতীয়াংশ বেরিয়ে গেলেই হবে না, মূল রাজনৈতিক দলের সংগঠনের দুই-তৃতীয়াংশের সংযুক্তি ঘটা বাধ্যতামূলক। স্পিকার ওম বিড়লা এই সাংবিধানিক নিয়মকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন, তার ওপরই নির্ভর করছে এই ২৬ জন (তৃণমূলের ২০ এবং শিবসেনার ৬) বিদ্রোহী সাংসদের ভবিষ্যৎ।
সাংসদ পদ খারিজের বিতর্কের পাশাপাশি বাদল অধিবেশনে লোকসভার অন্দরে সাংসদদের বসার নতুন বিন্যাস (seating association) নিয়েও তৎপরতা চলছে। তৃণমূল এবং শিন্ডে শিবিরের বিদ্রোহী সাংসদরা কোথায় বসবেন, তা স্পিকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের পর কংগ্রেসের পাশ থেকে সরে গিয়ে আলাদা বসার জায়গা চেয়েছে ডিএমকে (DMK seating association)। সেই আবেদনও খতিয়ে দেখছে লোকসভার সচিবালয়।
শনিবার দলত্যাগ বিরোধী আইনের সম্ভাব্য সংশোধন নিয়ে স্পিকার ওম বিড়লাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি স্পষ্ট জানান, আইনপ্রণেতাদের দলত্যাগ সংক্রান্ত সাংবিধানিক ও পদ্ধতিগত কাঠামো পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হলেও, দলত্যাগ বিরোধী আইন সংশোধন করা হবে কি না, তা রাজনৈতিক দলগুলোকেই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সব মিলিয়ে, ২০ জুলাইয়ের আগে স্পিকারের সিদ্ধান্ত শুধু এই সাংসদদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং ভারতের সংসদীয় ইতিহাসে দলত্যাগ বিরোধী আইনের কার্যকারিতা নিয়েও এক নতুন নজির স্থাপন করবে।

