উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: দিনটা আসার কথা ছিল, কিন্তু মন কিছুতেই তা মানতে প্রস্তুত ছিল না। ৮৫ হাজার দর্শকের ঠাসা বুয়নেস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম সেদিন কেবল একটা ফুটবল (Soccer) ম্যাচের সাক্ষী ছিল না; ওটা ছিল এক জীবন্ত কিংবদন্তির মহাপ্রস্থানের অলৌকিক লোকগাথা। স্বয়ং লিওনেল মেসিও (Lionel Messi) কি মানসিকভাবে তৈরি ছিলেন? উত্তরটা সম্ভবত কারও জানা নেই। ২১ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে যা কিছু জেতা সম্ভব, তার সবটাই তো তিনি দেশের ঝুড়িতে ভরে দিয়েছেন। তবুও যখন বেনিনের বিরুদ্ধে ৩-০ জয়ের ম্যাচে নিখুঁত এক গোল আর জোড়া অ্যাসিস্ট করলেন, তখন বুক চিরে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস—ইশ, আরও কিছুদিন যদি তিনি জার্সিতে থাকতেন!
ম্যাচের আগেই পুরো আকাশ আলো করে জ্বলছিল আতশবাজির রোশনাই। গ্যালারিতে তখন নীল-সাদার প্লাবন। বিশেষ এই বিদায়ী (Retirement) ম্যাচের জার্সিতে ছোঁয়া ছিল বিশ্বজয়ের সোনালি দীপ্তি। মা সেলিয়া, স্ত্রী আন্তোনেল্লা আর তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও ও সিরোকে পাশে নিয়ে যখন জাতীয় সংগীত গাইতে শুরু করলেন, তখন মেসির নিজেরই গলা ধরে এসেছিল। গ্যালারি থেকে ভেসে আসা ‘ওলে ওলে মেসি’ গর্জন আর মাঠের মাঝখানে ‘গ্রাসিয়াস ১০’ লেখা প্রকাণ্ড জার্সিটার দিকে তাকিয়ে কান্না চেপে রাখতে পারেননি সতীর্থ এনজো ফার্নান্দেজ থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থক পর্যন্ত।
মাঠে নেমেই মেসি বুঝিয়ে দিলেন, বয়স বা সময় তাঁর জাদুকরি বাঁ পায়ের ধার কমাতে পারেনি। ম্যাচের প্রথমার্ধে গোল না এলেও, দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দৃশ্যপট বদলে গেল। মেসির নিখুঁত কর্নার থেকে হেডে বল জালে জড়ায়ে উল্লাসে ফেটে পড়লেন ৩৮ বছরের পুরনো যোদ্ধা নিকোলাস ওতামেন্ডি। মিনিট কয়েকের মধ্যে বক্সের বাইরে থেকে মেসির বাড়ানো পাস থেকেই দুর্দান্ত এক শটে বল জালে জড়িয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করলেন তরুণ নিকো পাজ। এই গোলটিতে যেন ভবিষ্যতের আর্জেন্টিনাকে (Argentina) এক সুতোয় বেঁধে দিলেন খোদ ফুটবলের বরপুত্র।
আর এরপরেই এল সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিখুঁত শটে গোল করে দেশের জার্সিতে নিজের ১২৬ নম্বর গোলটি পূর্ণ করলেন মেসি। গোলরক্ষককে ভুল দিকে ছিটকে দিয়ে বল জালে জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই ফেটে পড়ল গোটা মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম। বেনিনের ফুটবলাররাও ম্যাচ শেষে সসম্মানে আলিঙ্গন করে নিলেন এলএমটিনোকে।
খেলা শেষে মাঠে যখন সতীর্থদের দেওয়া গার্ড অফ অনার পেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি, তখন ফ্লাডলাইটের আলোয় ঠিকরে বেরোচ্ছিল এক অদৃশ্য নক্ষত্রের দীপ্তি। ইতিহাস তো কেবল পরিসংখ্যান লেখে না, ইতিহাস লেখে ভালোবাসার গল্প। আর মেসি সেই ভালোবাসার অন্য নাম। বুয়নেস আইরেসের ভেজা বাতাসে সেদিন শুধু একটাই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল— বিদায় জাদুকর, গ্রাসিয়াস! সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।

