জয় মণ্ডল, নিউ ইয়র্ক: আজ মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন রেফারি ম্যাচ শুরুর বাঁশি বাজাবেন, তখন সারা বিশ্বের নজর থাকবে লিওনেল মেসি আর লামিনে ইয়ামালের দিকে। ট্রফিটা আর্জেন্টিনার হাতে উঠবে নাকি স্পেনের, তা নিয়ে নিউ জার্সির রাস্তায় এখন সমর্থকদের মধ্যে তর্ক আর উন্মাদনার শেষ নেই। এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে গত কয়েকদিন ধরে আমি খুব কাছ থেকে এই স্নায়ুযুদ্ধ দেখছি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, একটা লড়াইয়ের ফলাফল ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের যে অদৃশ্য যুদ্ধটা সবসময় চলে, সেখানে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ বা জার্মান বুন্দেশলিগাকে বহু যোজন পিছনে ফেলে আজ আসল চ্যাম্পিয়ন কিন্তু স্পেনের লা লিগা (La Liga Premier League)।
পরিসংখ্যানের দিকে একবার চোখ বোলালেই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। আজকের চূড়ান্ত ম্যাচে লা লিগার মোট ২৪ জন ফুটবলার মাঠে নামছেন। এর মধ্যে স্পেনের ১৮ জন এবং আর্জেন্টিনার ৬ জন। লা লিগা সভাপতি জাভিয়ের তেবাসের মতে, এটা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। স্প্যানিশ ফুটবলের যে সুদৃঢ় পরিকাঠামো বা পিরামিড রয়েছে, এটা তারই অবিসংবাদিত ফসল।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর একটা বড় প্রবণতা হল, দেদার টাকা ছড়িয়ে বিশ্বের সেরা তারকাদের কিনে আনা, যার জেরে অনেক ক্লাবকেই বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। কিন্তু লা লিগার আর্থিক নীতির কড়াকড়ির কারণে স্প্যানিশ ক্লাবগুলো চাইলেই যখন-তখন টাকা ওড়াতে পারে না। তাদের বাধ্য হয়ে নিজেদের অ্যাকাডেমির ওপর জোর দিতে হয়। শুধু বার্সেলোনার ‘লা মাসিয়া’ বা রিয়াল মাদ্রিদের ‘লা ফ্যাব্রিকা’ নয়, স্পেনের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা অখ্যাত অ্যাকাডেমিগুলোও আজ প্রযুক্তি আর শৃঙ্খলায় মুড়ে প্রতিভা তুলে আনার কারখানায় পরিণত হয়েছে। ১৩ বছর বয়সে আর্জেন্টিনা থেকে আসা মেসিকেও তো এই স্প্যানিশ পরিকাঠামোই সযত্নে লালনপালন করে আজকের ফুটবল ঈশ্বরে পরিণত করেছে।
এই দূরদর্শী নীতির প্রভাব শুধু মাঠের পারফরমেন্সেই আটকে নেই, পরিকাঠামোতেও লা লিগা আজ বিশ্বের কাছে এক আদর্শ মডেল। ২০২১ সালে সিভিসি ক্যাপিটাল পার্টনার্সের সঙ্গে প্রায় আড়াইশো কোটি ডলারের চুক্তির ৭০ শতাংশই স্প্যানিশ ক্লাবগুলো ব্যবহার করেছে উন্নত প্রযুক্তির স্টেডিয়াম আর পরিকাঠামো তৈরিতে। এখন লা লিগার স্টেডিয়ামগুলোর টিকিটিং থেকে শুরু করে এলইডি ডিসপ্লে বা অডিও ভিজুয়াল সিস্টেম- সবই কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা পাওয়া যাবে ২০৩০ সালে, যখন স্পেন, পর্তুগাল আর মরক্কো মিলে বিশ্বকাপ আয়োজন করবে। তেবাস সগর্বে জানিয়েছেন, স্পেনের স্টেডিয়াম সংস্কারের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে এক পয়সাও খরচ করতে হবে না। তাঁর কথায়, ‘সরকারকে বলেছি ওই টাকাটা বরং রাস্তার উন্নয়ন, স্কুল আর হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ করুন।’
তবে ফিফা যেভাবে বিশ্বকাপের বহর বাড়িয়ে ২০৩০ সালে ৬৪ দলের টুর্নামেন্ট করার পরিকল্পনা করছে, তা নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ লা লিগা সভাপতি। তাঁর মতে, এতে ঘরোয়া লিগগুলোর মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ বাড়ার অর্থ হল ঘরোয়া লিগগুলোর সম্প্রচার স্বত্ব, টিকিট বিক্রি এবং স্পনসরশিপের আয় কমে যাওয়া। তেবাসের স্পষ্ট অভিযোগ, ফিফা বা উয়েফার কর্তারা ফুটবল ক্লাব চালানোর বাস্তব সমস্যাগুলো বোঝেন না বলেই এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
সে যাই হোক, আজ নিউ জার্সির সবুজ ঘাসে যে দলের হাতেই সোনার ট্রফিটা উঠুক না কেন, বিশ্ব ফুটবলের আসল রিমোট কন্ট্রোলটা যে সেই লা লিগার হাতেই থেকে গেল, তা নিয়ে ফুটবল পণ্ডিতদের আর কোনও সংশয় নেই।

