বর্ধমান: শ্রীচৈতন্যদেবের পদধূলিধন্য পূর্ব বর্ধমানের জামালপুর ব্লকের ঐতিহ্যশালী জনপদ কুলীনগ্রাম। ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্ঠা সহকারে এখানে পালিত হয়ে আসছে রথযাত্রা উৎসব (Kulingram Rath Yatra)। পুরীর জগন্নাথদেবের রথযাত্রার সঙ্গে এই গ্রামের ঐতিহাসিক যোগসূত্র আজও ভক্তদের টানে।
কুলীনগ্রামের বসু পরিবারই এই রথযাত্রার সূচনা করেছিলেন। পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ কাব্যের রচয়িতা মালাধর বসুর পৌত্র লক্ষ্মীকান্ত বসু (যিনি ‘সত্যরাজ খান’ নামে পরিচিত) ছিলেন শ্রীচৈতন্যদেবের অন্যতম পার্শ্বদ। কথিত আছে, স্বয়ং চৈতন্যদেব তাঁকে আদেশ দিয়েছিলেন, পুরীর জগন্নাথদেবের রথের জন্য কুলীনগ্রাম থেকে ‘রেশমের পট্টডোরী’ পাঠাতে। বহু বছর ধরে সেই প্রথা পালিত হয়েছে। যদিও বর্তমানে পট্টডোরী পাঠানোর সেই বিশেষ প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তবুও কুলীনগ্রামের রথ ও পুরীর রথের মাহাত্ম্য ভক্তদের কাছে সমতুল্য।
কুলীনগ্রামের মধ্যস্থলে অবস্থিত জগন্নাথ মন্দিরে নিমকাঠের জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ পূজিত হয়। রথযাত্রা উপলক্ষে বিগ্রহগুলিকে নতুন রঙে সাজানো হয়। প্রায় ৩০ ফুট উঁচু এবং ১৬-১৭ ফুট দীর্ঘ রথটি শাল, সেগুন ও নিম কাঠ দিয়ে তৈরি। পূজারী শচীনন্দন মুখোপাধ্যায় জানান, এখানকার পুজোয় কাঁঠাল অপরিহার্য। এছাড়া জগন্নাথ দেবের জন্য খিচুড়ি ভোগ, বলরামের জন্য অন্নভোগ এবং সুভদ্রার জন্য পায়েস ভোগ রান্না করা হয়।
রথের দিন সকাল থেকে চলে বিশেষ পুজোপাঠ। রীতি মেনে রথের চারপাশ বিগ্রহগুলি সাতবার ঘোরানোর পর সেগুলিকে রথের ওপর বসানো হয়। বিকেলে রথ টেনে নিয়ে যাওয়া হয় কুলীনগ্রামের ‘রথতলা’য়, যেখানে অবস্থিত রঘুনাথ জিউয়ের মন্দিরটি জগন্নাথ দেবের ‘মাসির বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত। উল্টোরথের দিন পুনরায় বিগ্রহগুলিকে জগন্নাথ মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়।
বৈষ্ণবতীর্থ কুলীনগ্রামের রথযাত্রা এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও পরিচিত। রথযাত্রা উপলক্ষে এখানে বসে বিশাল মেলা এবং দেশ-বিদেশের ভক্তদের সমাগম ঘটে। পর্যটন বিভাগ কর্তৃক কুলীনগ্রাম ‘বাংলার অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। শ্রীচৈতন্যের স্মৃতি আঁকড়ে থাকা এই গ্রাম আজও অগণিত মানুষের কাছে এক পবিত্র তীর্থভূমি।

