পূর্ণেন্দু সরকার, জলপাইগুড়ি: দক্ষিণ বেরুবাড়ির ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভবানী কালী মন্দিরে প্রায় দুই শতাধিক বছর ধরে বংশপরম্পরায় কালীপুজো হয়ে আসছে (Kali Puja 2025)। এবারও দক্ষিণ বেরুবাড়ির বিন্নাগুড়ি মাঝাপাড়ার ভবানী কালী মন্দিরে গ্রামবাসীরা পুজোর আয়োজন করছেন। মন্দির কমিটির সদস্য অন্নকান্ত দাস বলেন, ‘নতুন কমিটি জেলা প্রশাসন ও রাজ্য সরকারকে ভবানী পাঠকের স্মৃতিবিজড়িত ভবানী কালী মন্দির ও দেবী চৌধুরানির গোপন সুড়ঙ্গ ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লিখিত প্রস্তাব দিয়েছে। শুধু হিন্দুরা নন, স্থানীয় ঝাঁপড়তলার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলিকে উদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য এগিয়ে এসেছেন।’ তাঁর সংযোজন, ‘ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের এই এলাকার জঙ্গল ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানির বিচরণক্ষেত্র ছিল। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে মন্দিরের ইতিহাস ও সুড়ঙ্গ নিয়ে চর্চার প্রয়োজন। সরকার উদ্যোগ নিলে সীমান্তের এই এলাকা হিস্টরিক্যাল ট্যুরিজমের মর্যাদা পেতেই পারে।’
স্থানীয় সূত্রে খবর, দেবী চৌধুরানি ও ভবানী পাঠক বাংলার অত্যাচারী জমিদারদের টাকাপয়সা ও গয়না লুট করে সেগুলি বর্তমান দক্ষিণ বেরুবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের ঝাঁপড়তলার (হাট) কাছে এক সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখতেন। ঝাঁপড়তলার বিএসএফ ক্যাম্পের কাছে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ভারতীয় সীমান্তের জমিতে এই সুড়ঙ্গের অস্তিত্ব দেখা যায়। এই সুড়ঙ্গ থেকে মাঝাপাড়ার ভবানী কালী মন্দিরের দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। কাঁটাতারের ওপারে ভারতীয় জমিতে ১৫০ গজের মধ্যে এই সুড়ঙ্গ এখন জঙ্গলে ঢেকে গিয়েছে। এখানকার প্রবীণ বাসিন্দা নবারুদ্দিন সরকারের কথায়, ‘‘কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে ভারতীয় এলাকায় আমার জমিতে সুড়ঙ্গ রয়েছে। সুড়ঙ্গ গিয়ে সুই নদীতে মিশেছে। বাবা প্রয়াত রহিমুদ্দিন সরকারের কাছ থেকে শুনেছি, এই সুড়ঙ্গ আসলে দেবী চৌধুরানি ও ভবানী পাঠকের নিজস্ব ‘ব্যাংক’ ছিল। লুট করা মূল্যবান সামগ্রী সন্ন্যাসী বিদ্রোহীরা এই সুড়ঙ্গে রাখতেন। সরকার চাইলে এই সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ভেতরে কী আছে দেখতে পারে।’’
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক হরিশচন্দ্র রায় জানান, আগে দক্ষিণ বেরুবাড়ির এই অঞ্চল রাজশাহি বিভাগের অধীনে ছিল। ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্তের মাঝখান দিয়ে ঘোড়ামারা, পাঙ্গা, যমুনা, করতোয়া ও সুই- এই নদী দিয়ে দেবী চৌধুরানির বজরা চলাচল করত। সেদিক থেকে দক্ষিণ বেরুবাড়ির অনেক জায়গায় ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানির স্মৃতিচিহ্ন থাকতে পারে। সেই ইতিহাস জানতে দুই দেশের তরফে বিস্তর অনুসন্ধান ও গবেষণার প্রয়োজন বলে হরিশচন্দ্র মনে করেন। আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মাধব বর্মনের বক্তব্য, ‘আগে খড়, পরে টিনের চালাঘরে পুজো হত। এখন মন্দির সংস্কার করা হয়েছে। সেখানে পুজো হয়।’ এলাকাবাসীর দাবি, মন্দিরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সত্যতা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
