খোকন সাহা, বাগডোগরা: ‘পায়ে পড়ি বাঘ মামা, কোরো নাকো রাগ মামা, তুমি যে এ ঘরে কে তা জানতো?’ বাঘ না হোক, চিতাবাঘ তো বটে। হেমন্তকাল হলেও এখন সকালের দিকে শীতের হালকা আমেজ থাকে। এমন সময় ‘মামা’র বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটাতেই বেজায় চটল সে।
মঙ্গলবার চুপটি করে বসেছিল শৌচালয়ের ভেতরে। ঘুম থেকে উঠে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে অভিষেক গুপ্ত দরজা খুলতেই তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল একটি চিতাবাঘ (Leopard Assault)। বন্যপ্রাণের আক্রমণে গুরুতর আহত হন তিনি। অভিষেক বর্তমানে মাটিগাড়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ নম্বর গেট সংলগ্ন শান্তিপুরে ওই ঘটনার পরই চিতাবাঘটি সেখান থেকে পালিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে খবর এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকায়। বুনোর খোঁজে কার্সিয়াং বন বিভাগের বাগডোগরা রেঞ্জ ও এলিফ্যান্ট স্কোয়াডের কর্মীরা তল্লাশি চালান। পটকাও ফাটান। তবুও তার আর দেখা মেলেনি। এদিকে, বেলা গড়াতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি সিসিটিভি ফুটেজ (যার সত্যতা যাচাই করেনি উত্তরবঙ্গ সংবাদ) ভাইরাল হয়। সেখানে দেখা গিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ নম্বর গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকছে একটি চিতাবাঘ। যদিও দিনভর ক্যাম্পাসে খোঁজ চালিয়েও তার টিকি থুড়ি লেজটি দেখা যায়নি।
বন বিভাগের বাগডোগরা রেঞ্জ অফিসার সোনম ভুটিয়া বলেছেন, ‘একজন জখম হয়েছে। আমরা মাইকিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করছি। সাবধান করছি। খাঁচা পাতা হয়েছে।’ বনকর্তা যতই সাবধানবাণী শোনান না কেন, বুনোর হদিস না পাওয়া পর্যন্ত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন না এনবিইউয়ের অধ্যাপক, পড়ুয়ারা। আতঙ্কে প্রহর কাটছে শান্তিপুরের বাসিন্দাদেরও।
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বন্যপ্রাণের আনাগোনা অবশ্য নতুন নয়। এর আগে হাতি, চিতাবাঘ ঢুকেছে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসের একাধিক অংশ ঝোপঝাড়ে ভরে গিয়েছে। এব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন। অনেকেই তাচ্ছিল্য করে বলেন, ‘চা গাছগুলো এতটাই লম্বা যে, বাগানের ভেতরে হাতি দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ টের পাবে না।’ বহু মানুষ সকাল-বিকেল চত্বরে হাঁটাহাঁটি করেন। তঁারাও চিন্তিত এদিনের ঘটনায়।
সকাল ৬টা ২০ মিনিট নাগাদ ঘটনাটি ঘটে। শান্তিপুরের বাসিন্দা বিশ্বনাথ দে’র বাড়ির শৌচালয়ে ঘাপটি মেরে বসেছিল ওই চিতাবাঘ। সেই বাড়ির নীচতলায় ভাড়া থাকেন অভিষেক। বুনো তাঁর শরীরের একাধিক জায়গায় থাবা বসিয়েছে। দুজনের মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি হয়। কোনওরকমে পালিয়ে বাড়ির বাইরে এসে চিৎকার করতে থাকেন তিনি। তখন পাশেই নিজের নির্মাণসামগ্রীর দোকান পরিষ্কার করছিলেন আঠারোখাই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান অসিতকুমার নন্দী। চিৎকার শুনে তিনি ও বিশ্বনাথ ছুটে আসেন। চলে আসেন অন্য প্রতিবেশীরাও। বিশ্বনাথের বক্তব্য, ‘বন্যপ্রাণ বাড়িতে ঢুকে বসেছিল, এখনও সেটা বিশ্বাস হচ্ছে না। অভিষেকের চিৎকার শুনে বেরিয়ে দেখলাম, ওর সারা গায়ে থাবা বসানো। তবে, চিতাবাঘের দেখা পাইনি। বাড়ির সবাই ভীষণ ভয়ে আছি।’
তার আগেই চিতাবাঘটি পাশের বাড়ি আম গাছে উঠে পড়েছিল। এদিন সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে ছিলেন নিরাপত্তারক্ষী পবিত্র বর্মন। তাঁর দাবি, ‘আম গাছ থেকে লাফ দিয়ে নীচে নামতে দেখলাম। এরপর নিমেষের মধ্যে কোথায় যেন চলে গেল ওটা।’
খবর পেয়ে মাটিগাড়া থানার পুলিশ এবং বাগডোগরা রেঞ্জ, এলিফ্যান্ট স্কোয়াডের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। প্রথমে সেই বাড়ির আনাচে-কানাচে খোঁজাখুঁজি করেন তঁারা। পটকা ফাটানো হয়। তবে সবাইকে নিরাশ করে সে আর দর্শন দেয়নি। এনবিইউয়ের নিরাপত্তা আধিকারিক বরুণ রায়ের কথায়, ‘মাইকিং করে সাবধান করা হচ্ছে সবাইকে। হস্টেলের পড়ুয়াদের সন্ধের পর আর ভোরবেলায় বাইরে বেরোতে নিষেধ করা হয়েছে। বাইরের লোকজনকেও হাঁটতে মানা করা হয়েছে আপাতত।’
