শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি: উত্তরবঙ্গের শীত এখনও সেভাবে কুয়াশার পর্দা নামায়নি, কিন্তু রাজনৈতিক আবহাওয়ায় কুয়াশার ঘনত্ব যেন কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছে। ২০২৬-এর ভোট যত এগিয়ে আসছে, ততই জল্পনা গাঢ় হচ্ছে গুয়াহাটির এক অজ্ঞাত ঠিকানাকে ঘিরে। যেখানে নিরাপত্তাবলয়ের ভেতরে বসে কেএলও সুপ্রিমো জীবন সিংহ (Jiban Singha) ভোটের ঘুঁটি সাজাচ্ছেন; চেষ্টা করছেন নতুন সমীকরণ তৈরির। আর সেই সমীকরণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাজবংশী ভোট, আর তার চারপাশে ঘুরছে উত্তরের রাজনীতির অদৃশ্য চাকা। জীবনকে অজ্ঞাতবাসে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সেখানে বসে জীবনের ভোট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় যে কেন্দ্রীয় সরকারি দল বিজেপিরই মুনাফা হবে আপাতত তা স্পষ্ট। সেই আবহেই বিধানসভার আগে উত্তরের রাজবংশী ভোটব্যাংক নিয়ে নতুন করে হিসেব কষা শুরু হয়েছে। জীবন সক্রিয় হতেই মেপে পা ফেলতে চাইছে তৃণমূল নেতৃত্বও।
উত্তরবঙ্গের বহু আসনে রাজবংশী ভোট নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়। তাই সেই ভোট পেতে মরিয়া শাসক, বিরোধী দুই পক্ষই। বঞ্চনা, পৃথক রাজ্যের দাবি সহ নানা কারণে শেষ কয়েকটি নির্বাচনের নিরিখে উত্তরের রাজবংশী ভোটের একটা বড় অংশই বিজেপির দিকে ঝুঁকে রয়েছে। রাজবংশী ভোট নিশ্চিত করতে নগেন রায়কে সাংসদ বানিয়েছিল পদ্ম শিবির। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে সমীকরণের ছবি ক্রমেই বদলাচ্ছে। সাংসদ হওয়ার পর থেকেই নানা সময় প্রকাশ্যেই বিজেপির বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন নগেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নগেনের সখ্য বিজেপির অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন তুলেছে। গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের আর এক পক্ষের নেতা বংশীবদন বর্মনের ভূমিকা নিয়েও জল্পনা তুঙ্গে। তৃণমূলের সহযোগী দল হিসাবে গত কয়েকটি নির্বাচনে ঘাসফুলে ভোট দেওয়ার আবেদন করেছিলেন বংশীবদনরা। এবার উত্তরের রাজবংশী অধ্যুষিত ২৫টি আসন তাদের না ছাড়লে তাঁরা যে তৃণমূলের সঙ্গ ছাড়তে পিছপা হবেন না সেকথা ইতিমধ্যেই ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন বংশীবদন। এতদিন রাজবংশী ভোটের মূল নিয়ন্ত্রক হিসাবে নগেন এবং বংশীবদন এই দুই পক্ষকেই বোঝানো হত। ২০২৬-এর বিধানসভার আগে তিনি যে তৃতীয় পক্ষ হিসাবে মাঠে নামছেন তা স্পষ্ট করেছেন জীবন।
কেএলও চিফের কথা, ‘পৃথক রাজ্যের দাবিদার সব পক্ষের সঙ্গেই কথা হয়েছে। আমাদের সব বোঝাপড়া কেন্দ্রের সঙ্গে। তৃণমূল এবং বিজেপির বেশ কিছু নেতার সঙ্গেও আমার নিয়মিত যোগাযোগ আছে। সবাইকে নিয়েই ঐক্যবদ্ধভাবেই এবার মাঠে নামছি।’ প্রশাসনের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, কামতাপুর সেপারেট স্টেট ডিমান্ড কমিটির মাধ্যমেই কাজের পরিকল্পনা করেছেন জীবন। কমিটির নেতারাও অবশ্য সেকথা অস্বীকার করেননি। গোপন আস্তানায় গিয়ে দিনকয়েক আগেই জীবনের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছেন কমিটির মুখপাত্র অনন্ত বর্মন। তাঁর বক্তব্য, ‘আমাদের দল কয়েক বছর আগে তৈরি হলেও জীবন সিংহই আমাদের অভিভাবক। সমস্ত প্রক্রিয়া শেষে ফিরে তিনিই আমাদের নেতৃত্ব দেবেন। তিনি না দিতে চাইলেও আমরা তাঁকে ছাড়ব না।’ সূত্রের খবর, জীবনের প্রতিনিধি হিসাবে ইতিমধ্যেই স্টেট ডিমান্ড কমিটির নেতারা পৃথক রাজ্যের দাবিতে আন্দোলনরত এবং রাজবংশী সম্প্রদায়কে নিয়ে কাজকর্ম করছে এমন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তারা জীবনের সক্রিয় হওয়ার পেছনে বিজেপির হাত দেখলেও জীবন বা স্টেট ডিমান্ড কমিটির নেতারা রাজ্য বিজেপিকে চাপে রাখতে কৌশলী চাল দিয়েছেন। সরাসরি তৃণমূলের বিরোধিতা করলেও রাজ্য বিজেপির নেতাদেরও যে তাঁরা ভরসা করেন না সেকথা স্পষ্ট জানিয়েছেন অনন্ত। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা শুভেন্দু অধিকারীদেরও বিশ্বাস করি না। তবে দিল্লির বিজেপির প্রতি এখনও আমাদের আস্থা আছে।’ জীবনের কথা, ‘রাজ্য বিজেপির নেতারা তৃণমূলের সঙ্গেই মিশে আমাদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। তাই তাদের ভরসা নেই। তবে আমরা তৃণমূলের পক্ষে নই।’ প্রশাসনের কর্তারা মনে করছেন, বিজেপিকে চাপে রাখতেই এই অর্ধ-সমর্থন, অর্ধ-সতর্কতার রাজনীতি করছেন জীবন। জীবন বা স্টেট ডিমান্ড কমিটির বিষয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করতে চাননি নগেন রায়। বংশীবদনপন্থী নেতারাও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ। তবে দুই গোষ্ঠীর একাধিক নেতাই স্টেট ডিমান্ড কমিটির সঙ্গে তাঁদের বৈঠকের কথা স্বীকার করেছেন। নগেন এবং বংশীবদনপন্থী গ্রেটার নেতাদের সঙ্গে কয়েক দফায় আলোচনার কথা মেনে নিয়েছেন অনন্ত। তাঁর বক্তব্য, ‘এখনও উত্তরবঙ্গ ও নিম্ন অসমের ৩৫টি সংগঠনকে আমরা একত্রিত করেছি। নগেন ও বংশীপন্থী নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।’
ভোটের আগে কোন ছক কষছেন জীবন সেদিকে সতর্ক নজর রাখছেন পুলিশের গোয়েন্দারা। আইপ্যাকের সদস্যরাও নানাভাবে খোঁজখবর শুরু করেছেন। যদিও প্রকাশ্যে এসব বিষয়কে আমল দিতে নারাজ রাজ্য তৃণমূল নেতারা। মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের কথা, ‘রাজবংশী সম্প্রদায়ের উন্নয়নে সবথেকে বেশি কাজ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাদের সমর্থন আমাদের সঙ্গেই রয়েছে।’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য জীবনকে নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে জীবনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন হোক বা নীরব সায়- দুটোই রাজবংশী ভোটব্যাংকে বিরাট ওলটপালট ঘটাতে পারে তা ভালোই বুঝছেন রাজ্যের শাসকদলের নেতারা। ফলে অনিশ্চয়তা, সন্দেহ, সম্ভাবনা- সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর উত্তেজনা, যা উত্তরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আরও রহস্যময় করে তুলছে।
