সানি সরকার, শিলিগুড়ি: এবার আর গুড় খেতে হবে না, কথাগুলি বলার সময় আক্ষেপ ঝরে পড়ল আব্বাসউদ্দিনের গলায়। শীতের চাদর একটু ভারী হলেই গজলডোবার টাকিমারিতে ব্যস্ততা বেড়ে যায় প্রৌঢ় আব্বাসউদ্দিনের। সাতসকালে খেজুরের রস কেনা, জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করে আমবাড়ি, শিলিগুড়িতে তা নিয়ে এসে বিক্রি করা। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, তিন দশকের বেশি সময় ধরে শীতের রুটিন। এসময় তাঁর ব্যস্ততা এতটাই থাকে যে, ‘পরে কথা হবে’ বলে পাশ কাটান। কিন্তু এখন দুপুরের রোদ অলস শরীরে মাখছেন আব্বাসউদ্দিন। কাজ, ব্যস্ততা নিয়ে প্রশ্ন করতেই, উত্তর এল, ‘শীত কোথায় যে রস পাব?’
ঠান্ডার প্রকোপ যে নেই, তা নয় (Climate Replace)। রাত হলেই পারদ পতন ঘটছে হুহু করে। বুধবার তো দার্জিলিংয়ের তাপমাত্রা পৌঁছে যায় ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে। গ্যাংটক দাঁড়িয়ে ৭.৮-এ। অথচ শিলিগুড়ির সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩.৭ এবং কোচবিহারে অনেকটা কমে ৯.৯ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। পাহাড়ে শুধু রাতে নয়, দিনের আলোতেও রয়েছে ঠান্ডার প্রকোপ। কিন্তু সমতলে দিনে সেই পরিস্থিতি নেই। আব্বাসউদ্দিনের কথায়, ‘সূর্য উঠতেই তো শীত উধাও। রাতের রস দিনে জল হয়ে যাচ্ছে।’ জাঁকিয়ে ঠান্ডা না পড়লে যে খাঁটি খেজুর গুড় মিলবে না, স্পষ্ট হয় তাঁর বক্তব্যে। শীতের এমন সময় ঠান্ডা না পড়া, অতীতে দেখা যায়নি বলে শিলিগুড়ি থেকে কোচবিহার, সর্বত্র আলোচনা। নিউ আলিপুরদুয়ারের রত্না দেবনাথের বক্তব্য, ‘রাত এবং দিনের আবহাওয়ায় এমন পার্থক্য আগে দেখিনি। দিনে তো যথেষ্ট গরম লাগছে।’ জলপাইগুড়িতে এদিন দিনের তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। পান্ডাপাড়ার জিতেন সরকার বললেন, ‘মনেই হচ্ছে না আজ ডিসেম্বরের ১০ তারিখ।’
দু’-একদিনের মধ্যে উত্তরে জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়বে, এমন পূর্বাভাস দিতে পারছে না আবহাওয়া দপ্তরও। বরং এবার কনকনে শীত যে বিলম্বিত, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছেন আবহবিদরা। সাধারণত পশ্চিমী ঝঞ্ঝার ওপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলের শীত। কিন্তু এখনও শক্তিশালী ঝঞ্ঝার উপস্থিতি নেই। তাৎপর্যপূর্ণভাবে অক্টোবরের শেষ এবং নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শক্তিশালী ঝঞ্ঝা পাওয়া গিয়েছিল, যার জন্য পূর্ব ও উত্তর সিকিমে তুষারপাত ঘটেছিল। কিন্তু অসময়ে মিললেও, সময়ে দেখা নেই। মিলছে না উত্তর-পশ্চিম ভারত থেকে আসা উত্তুরে হাওয়াও। ফলে দিনে মিলছে না শীতের আমেজ। আবহাওয়া দপ্তরের সিকিমের কেন্দ্রীয় অধিকর্তা গোপীনাথ রাহার কথায়, ‘কয়েকটি ঝঞ্ঝা এলেও তা শক্তিশালী না হওয়ায় উপর দিয়ে উত্তরে বেরিয়ে যাচ্ছে। এই অঞ্চলের হিমালয়ে ধাক্কা খাওয়ার মতো ঝঞ্ঝা এখনও অনুপস্থিত। ফলে দিনের তাপমাত্রায় তেমন হেরফের ঘটছে না। তার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।’
এমন পরিস্থিতি কেন? আঙুল তোলা যায় বঙ্গোপসাগরের দিকেই। বঙ্গোপসাগরে একের পর এক নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ায় বিপরীতধর্মী ঘূর্ণাবর্ত তৈরি হয়নি বা হওয়ার সুযোগ মেলেনি। ফলে উত্তরের আকাশ দিনের পর দিন থাকছে মেঘমুক্ত। জলীয় বাষ্পের অভাবে বৃষ্টির সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে না। ফলে মেঘমুক্ত আকাশের তেজে উত্তরবঙ্গ টেরই পাচ্ছে না এখন অগ্রহায়ণ।
খেজুরের রস গাঢ় না হলে পৌষের পিঠে-পায়েস কি জমাট বাঁধবে, দুশ্চিন্তা বাঙালির উৎসবের হেঁশেলে!
