সোমনাথ দত্ত, মালবাজার : মেঘে ঢাকা পাহাড়ি বন। কুয়াশার চাদরে মোড়া সবুজ উপত্যকা। তারই মাঝে গাছের ডালে ডালে বিরল প্রজাতির পাখির অবাধ বিচরণ। কখনও ভেসে আসছে নাম না জানা পাখির ডাক, কখনও বা ডানা মেলে উড়ে যাচ্ছে রঙিন পাখি। কালিম্পং জেলার গরুবাথান ব্লকের পাহাড়ি জনপদ ঝান্ডিতে প্রকৃতির এমনই এক অনন্য জগৎ গড়ে উঠেছে। পাখিপ্রেমীদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠছে এই এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দা দোরজি শেরপার বক্তব্য, ‘এলাকায় অনেক বিরল প্রজাতির পাখি রয়েছে। তাদের বিরক্ত না করে প্রকৃতির মাঝে তাদের বিচরণ উপভোগ করাটাই আমাদের লক্ষ্য। ঝান্ডির পরিচিতি বাড়ুক পাখির আবাসস্থল হিসেবে, পর্যটকদের ভিড়ের কেন্দ্র হিসেবে নয়।’
ঝান্ডি ও সংলগ্ন জঙ্গলে দেখা মিলছে হিমালয়ান কিউটিয়া, স্কারলেট ফিঞ্চ, রেড হেডেড ট্রোগন এবং স্যাফায়ার ফ্লাইক্যাচারের মতো নানা প্রজাতির পাখির। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে দেড়শোরও বেশি প্রজাতির পাখির উপস্থিতির কথা জানা গিয়েছে। বিরল পাখির তালিকায় রয়েছে রুফাস নেকড হর্নবিল, গ্রে হর্নবিল, ওরিয়েন্টাল পাইড হর্নবিল এবং গ্রেট হর্নবিলও। পাহাড়ি বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশে তাদের বিচরণ এই এলাকার জীববৈচিত্র্যকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৩০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ঝান্ডির পাশাপাশি ডোরখোলা ও পাশাবং এলাকাও পাখির গুরুত্বপূর্ণ বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ঘন সবুজ বন, নিরিবিলি পরিবেশ এবং মানুষের কোলাহল থেকে দূরত্ব পাখির স্বাভাবিক জীবনযাপনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। সেই কারণেই পরিবেশপ্রেমী ও পাখিপ্রেমীদের কাছে এই অঞ্চল ক্রমশ পরিচিতি পাচ্ছে ‘পাখির স্বর্গরাজ্য’ হিসেবে।
তবে পাখির এই আবাসস্থলকে ঘিরে পর্যটনের প্রসার নিয়ে সতর্ক স্থানীয় পরিবেশপ্রেমীরা। তাঁদের আশঙ্কা, পর্যটকদের ভিড়, শব্দদূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত আনাগোনা পাখির স্বাভাবিক বিচরণে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। পরিবেশপ্রেমী স্বরূপ মিত্রের কথায়, ‘আমরা চাই না পাশাবং, ডোরখোলা ও ঝান্ডিতে লাটপাঞ্চারের মতো পর্যটকদের ভিড় বাড়ুক। পাখিরা নিজেদের বিচরণক্ষেত্রে সাবলীল থাকুক।’
বন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, পাখির নিরাপদ আবাসস্থল ঠিকঠাক রাখাই অন্যতম লক্ষ্য। পর্যটনের নামে যাতে এই প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর রাখা হচ্ছে। এজন্য বন দপ্তরের তরফে, ঝান্ডির বনাঞ্চল এলাকায় বিনা অনুমতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়া নজরদারি শুরু হয়েছে। পাশাপাশি হোমস্টে কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের মধ্যে বনাঞ্চল রক্ষা নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে পদক্ষেপ করা হয়েছে। শান্তশিষ্ট ঝান্ডি এলাকায় উচ্চস্বরে গান বাজানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। প্লাস্টিক, আবর্জনামুক্ত এলাকা গড়ে ঝান্ডিকে পাখির জন্য বাসযোগ্য করতেও পদক্ষেপ করা হয়েছে।

