শুভাশিস বসাক ও সৌরভ দেব, ধূপগুড়ি ও জলপাইগুড়ি: বিএলও বাড়িতে এসে নথিপত্র যাচাই শুরু করতেই এক বাংলাদেশি বৃদ্ধের মৃত্যু হল। ধূপগুড়ি ব্লকের বারোঘরিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের দক্ষিণ ডাঙ্গাপাড়া এলাকায় লালুরাম বর্মন (৮০) নামে ওই বৃদ্ধের মৃত্যুতে রাজনৈতিক তর্জাও শুরু হয়েছে। এদিকে শুক্রবার দুপুরে জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri) সদর ব্লকের খড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের জগন্নাথ কলোনি এলাকায় বাড়ি থেকে কিছুদূরে একটি গােছ নরেন্দ্রনাথ রায় (৬৫) নামে ব্যক্তির ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের দাবি, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর দুই স্ত্রীর কারও নাম না থাকায় তিনি মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। তার থেকেই আত্মহত্যা করেছেন তিনি।
ধূপগুড়ির বারোঘরিয়ায় ওই পরিবার সূত্রে খবর, বৃহস্পতিবার বিকেলে ১৫/১৭০ নম্বর অংশের বিএলও সুমিত রায় লালুরাম বর্মনের বাড়িতে নথিপত্র যাচাই করার সময় তাঁর মৃত্যু হয়। শুক্রবার সকাল থেকেই এই মৃত্যু নয়া মোড় নিতে শুরু করে। আর এই ইস্যুটিকেই হাতিয়ার করে অভিযোগ তুলেছে শাসক শিবির। মৃতের ছেলে সঞ্জীব বর্মন স্বীকার করেছেন, তাঁর বাবার ভোটার কার্ড নেই। তাঁর কথায়, ‘অনেকদিন থেকেই বাবা অসুস্থ ছিল, চিকিৎসাও চলছিল। বৃহস্পতিবার বিকেলে বাড়িতে এসে বিএলও নথি যাচাই করছিলেন। ঘরে বাবা অসুস্থ অবস্থায় ছিল। কিন্তু বিএলও যে বাড়িতে এসেছেন বাবা জানতেন না।’ প্রায় ২৬ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে তঁারা বারোঘরিয়ায় এসেছেন বলেও জানিয়েছেন সঞ্জীব।
শুক্রবার সকালেই পুরো ঘটনায় শোরগোল শুরু হয়। ধূপগুড়ি পঞ্চায়েত সমিতির সহ সভাপতি দীপু রায় ওই বাড়িতে যান। সেখানে দাঁড়িয়েই দীপু বলেন, ‘অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। রাজ্যজুড়েই এসআইআর নিয়ে অরাজকতা চালানো হচ্ছে। অসুস্থ হোক বা সুস্থ হোক, মানুষ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। আতঙ্কিত হয়ে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। আমরা পরিবারটির পাশে রয়েছি।’
পরিবারের লোকের অনুমান, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই ওই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তবে বাড়িতে মৃত্যু হলেও তঁারা ময়নাতদন্ত করাননি। হিন্দু রীতি মেনে দাহকাজ সম্পন্ন করেছেন পরিবারের লোকেরা। জলপাইগুড়ি বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য ঈশ্বর রায় দাবি করেছেন, ‘লালুরাম বর্মনের মৃত্যুর সঙ্গে এসআইআরের কোনও সম্পর্ক নেই। বাড়িতে যে বিএলও এসেছেন বা এসআইআরের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না ওই ব্যক্তি। তবে, প্রায় ২৬ বছর আগে তিনি বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন। তখনই অনেক বয়স হয়েছিল। সেই কারণে আর ভোটার কার্ড করাননি। তবে তাঁর ছেলেমেয়েদের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে। মৃত্যু নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস অযথা রাজনীতি করছে।’ পুরো বিষয়টি ব্লক প্রশাসনকে জানিয়েছেন বিএলও সুমিত রায়। সুমিত রায় জানান, ব্লক প্রশাসন থেকে এই বিষয়ে কিছু বলতে নিষেধ করা হয়েছে।
জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের খড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের জগন্নাথ কলোনির বাসিন্দা নরেন্দ্র একসময় ভ্যানচালক ছিলেন। তঁার দুই স্ত্রী। সম্প্রতি তিনি জানতে পারেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নিজের নাম থাকলেও দুই স্ত্রী বিনোদিনী ও মিনতির নাম নেই। ভোটার তালিকার নাম না থাকার বিষয়টি এদিন স্বীকার করেছেন বিনোদিনীও। পরিবারের সদস্যরা জানান, এদিন দুপুর ১টা নাগাদ বাড়ির কাউকে কিছু না বলে বেরিয়ে গিয়েছিলেন নরেন্দ্র। তারপরেই তঁারা প্রতিবেশীদের থেকে খবর পান, বাড়ি থেকে ২০০ মিটার দূরে একটি নির্জন জায়গায় গাছের ডালে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় তাঁর দেহ ঝুলছে। খবর যায় কোতোয়ালি থানায়। পুলিশ গিয়ে নরেন্দ্রকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজে পাঠালে চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। নরেন্দ্রর মেয়ে জয়ন্তী বর্মন বলেন, ‘যেদিন থেকে বাবা জানতে পেরেছেন ভোটার তালিকায় মায়ের নাম নেই সেদিন থেকে আমাদের বলতেন মায়ের কী হবে? মাকে কোথায় নিয়ে যাবে? তিনি খুবই চিন্তায় ছিলেন। আমাদের মনে হয়, এইসব দুশ্চিন্তা থেকেই বাবা এমনটা ঘটিয়েছেন।’
স্থানীয় তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য শোভন রায় বলেন, ‘নরেন্দ্র আমার কাছে অন্তত তিনবার এসেছেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ভোটার তালিকায় নেই এই বিষয়টি নিয়ে তিনি খুবই চিন্তিত ছিলেন।’ ঘটনার খবর পেয়ে নরেন্দ্রর বাড়িতে যান খড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান মনোজ ঘোষ। তিনি বলেন, ‘আমি স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য এবং পরিবারে সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম উনি চিন্তিত ছিলেন। আমরা মৃতের পরিবারের পাশে রয়েছি।’
