আলিপুরদুয়ার: জঙ্গলে লাগাতার টহল, কড়া নজরদারি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অপরাধীদের দ্রুত শাস্তির ওপর ভর করে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান এক নয়া রেকর্ড গড়েছে। গত পাঁচ বছরে এই জঙ্গলে একটিও গন্ডার শিকার হয়নি। দীর্ঘদিন পর বন দপ্তর এই ধরনের বড় সাফল্য পেল। একসময় চোরাকারবারি ও শিকারিদের দাপটে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান (Jaldapara Nationwide Park) কর্তৃপক্ষকে চরম নাজেহাল হতে হয়েছিল। এই নিয়ে শুধু রাজ্য নয়, দেশজুড়েও ব্যাপক চর্চা চলেছে। সেই জায়গা থেকে জলদাপাড়ার (Jaldapara rhino success) এই নতুন সাফল্য এখন সর্বত্র সমাদৃত হচ্ছে।
২০২১ সালের পর ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত আর কোনও গন্ডার শিকারের ঘটনা ঘটেনি। এটিকে অন্যতম বড় সাফল্য বলেই আধিকারিকেরা মনে করছেন। এ বিষয়ে বন দপ্তরের এক শীর্ষকর্তা বলেন, ‘এই সাফল্য সম্মিলিত কাজের জন্যই এসেছে। যে কর্মীরা জঙ্গলে সবসময় টহল দেন তাঁদের কৃতিত্ব সব থেকে বেশি। ওয়াচ টাওয়ারগুলোয় সবসময় কর্মীরা সতর্ক থাকে। আর ক্যামেরা, ড্রোন দিয়েও ভালো নজরদারি চলছে কয়েক বছর থেকে।’
বনাধিকারিকদের ধারণা, শুধু নজরদারি বৃদ্ধিই নয়, বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত মামলায় অপরাধীদের দ্রুত সাজা হওয়াতেও দুষ্কৃতীদের মনে ভয় তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। ২০২৫-’২৬ অর্থবর্ষে বন্যপ্রাণ হত্যা ও বন্যপ্রাণীদের দেহাংশ পাচার সংক্রান্ত ১৩টি পৃথক মামলায় বন দপ্তর ২২ জনকে সাজা দিতে সফল হয়েছে। দ্রুত তদন্ত শেষ করে আদালতে মামলার শুনানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, যা বন্যপ্রাণ সংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে সারা দেশের মধ্যে এক নজিরবিহীন ঘটনা। অতীতে বন্যপ্রাণী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের ওপর লাগাতার নজরদারিও এই সাফল্যের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২১ সালের ৪ এপ্রিল বনকর্মীরা চিলাপাতার জঙ্গল (Chilapata Forest) থেকে একটি গন্ডারের পচাগলা দেহ উদ্ধার করেছিলেন। চোরাশিকারিরা ওই গন্ডারের শিং কেটে নিয়েছিল। সেই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ ও বন দপ্তর যৌথভাবে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে ও একটি আন্তঃরাজ্য পাচারচক্রের সন্ধান পায়। সেই মামলাটি এখনও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে ওই ঘটনার পর থেকে জলদাপাড়ায় আর কোনও গন্ডার শিকার হয়নি। ১৯৮৫ সালে জলদাপাড়ায় গন্ডারের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪। এর পর থেকেই বন দপ্তর এই জঙ্গলে গন্ডারের আদর্শ ও নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করতে অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। তার জন্য সবথেকে বেশি প্রয়োজন ছিল চোরাকারবার ঠেকানো। পরবর্তীতে বন দপ্তরের নানামুখী উদ্যোগ এবং যৌথ বন পরিচালন কমিটির সহযোগিতায় জলদাপাড়া ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। তবে এর মাঝেও শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। ২০১৭-’১৮ সালের মধ্যে জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে পরপর চারটি গন্ডার হত্যার ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় রাজ্যে তুমুল আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। এরপর অরণ্যে নজরদারির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়। বর্তমানে গোটা জঙ্গলে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ জন বনকর্মী দিনরাত টহলের কাজে নিযুক্ত থাকেন। ২০২৫ সালের মার্চ মাসের গন্ডার শুমারিতে দেখা গিয়েছে যে, জঙ্গলে বর্তমানে প্রায় ৩৩১টি গন্ডার রয়েছে। ২০২২ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ২৯২। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গন্ডারের সংখ্যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৪.২৭ শতাংশ।

