উত্তরবঙ্গ সংবাদ অনলাইন ডেস্ক: বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট দ্রুত বদলাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অবস্থান বদল। নয়াদিল্লিতে আয়োজিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘মিউনিখ লিডার্স মিটিং’-এ (Jaishankar Munich Assembly) বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শংকর আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই নতুন সমীকরণটি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, আমেরিকা এখন স্বেচ্ছায় নিজেদের একটু গুটিয়ে নিচ্ছে এবং তারা সচেতনভাবেই আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘একঘরে’ বা নিঃসঙ্গ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। জয়শংকরের কথায়, “এই ঘরে উপস্থিত কেউই এই তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন না যে, বর্তমান প্রেক্ষাপট মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমূল অবস্থান পরিবর্তনের দ্বারাই চিহ্নিত। এই পরিবর্তন তাদের নিজস্ব পছন্দের অবস্থান, এবং একপ্রকার তারা জেনেশুনেই একটি নিঃসঙ্গ শক্তিতে পরিণত হয়েছে।”
মার্কিন নীতির পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকেও এই নয়া বিশ্বব্যবস্থার একটি বড় বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন বিদেশমন্ত্রী। বেজিং বরাবরই নিজেদের একটি ‘অনন্য দেশ’ হিসেবে তুলে ধরে। জয়শংকরের মতে, চিনের এই আত্মোপলব্ধি অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের বর্তমান বাস্তব অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি বলেন, “অবশ্যই এই প্রেক্ষাপটের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল চিনের উত্থান। চিন নিজেদের একটি অনন্য দেশ হিসেবে দেখে এবং তাদের এই নিজস্ব ধারণাটি বহুলাংশেই বাস্তব।” তবে আজকের দিনে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার লড়াই শুধুমাত্র আমেরিকা বা চিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন দেশ এখন নিজেদের সুবিধামতো যেকোনো বিষয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিযোগিতায় নামছে। বিদেশমন্ত্রীর কথায়, তীব্র কৌশলগত রেষারেষির পাশাপাশি দেশগুলোর মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নির্ভরতাও এক অদ্ভুতভাবে সহাবস্থান করছে। “আমরা এখন এক অত্যন্ত তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি। সেই প্রতিযোগিতা আজ আর কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ফলে যেকোনো দেশের হাতে থাকা ক্ষমতার চূড়ান্ত সমরাস্ত্রকরণ বা ওয়েপোনাইজেশন ঘটেছে। আর এই প্রতিযোগিতাই আবার পারস্পরিক নির্ভরতার জটিলতার সঙ্গে সহাবস্থান করছে,” মন্তব্য করেন তিনি।
ভূ-রাজনৈতিক এই প্রতিযোগিতার বাইরে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারত। কারণ, সুদূর ওই অঞ্চলে যুদ্ধের আঁচ সরাসরি এসে পড়ছে আমজনতার হেঁশেলে। জ্বালানি সরবরাহ, বাণিজ্য এবং পণ্য পরিবহণে যে বড়সড় ধাক্কা লাগছে, সেটাই নয়াদিল্লির প্রধান চিন্তার কারণ। জয়শংকর স্পষ্ট ভাষায় জানান, ভারত পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) সই করেনি এবং নিজেদের অধিকার সুরক্ষিত রেখেছে, কিন্তু ইরান এই চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ। ফলে দুটি দেশের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। বিদেশমন্ত্রী বলেন, “ইরান ইস্যুতে বলতে গেলে, ভারত এমন একটি দেশ যারা এনপিটি-তে সই করেনি এবং নিজস্ব অধিকার বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ইরান এনপিটি-তে সই করেছে। তাই পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। আমাদের কাছে তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় হল এই সংঘাতের জেরে জ্বালানি ও বাণিজ্যে ঘটে যাওয়া ব্যাঘাত… জ্বালানির বাজার গভীরভাবে অস্থির হয়ে পড়েছে… সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, চাকরি এবং তাদের জীবিকা আজ প্রশ্নের মুখে, কারণ আমরা মূলত বিশ্বের ওই অংশের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম।”
এই অস্থিরতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে দ্রুত জ্বালানি ও বাণিজ্যের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর মতে, যে যুদ্ধে ভারতের কোনো ভূমিকা নেই, তার মাশুল গুনতে হচ্ছে দেশকে। মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সের উদ্যোগে আয়োজিত এই মিউনিখ লিডার্স মিটিং আসলে একটি রুদ্ধদ্বার আন্তর্জাতিক বৈঠক। বছরে এক বা দু’বার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এখানে ‘চ্যাথাম হাউস রুল’ মেনে সর্বোচ্চ ৮০ জন শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করে থাকেন। নয়াদিল্লির এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকেই বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এল এক নতুন, জটিল ও বহুমাত্রিক বিশ্বের সুস্পষ্ট চিত্র।

