বর্ধমান: জন্মের সময় থেকেই নেই দুটি হাত। তবুও সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি আজ একজন সফল প্রাথমিক শিক্ষক (Jagannath Bauri)। কিন্তু বছরে একটি দিন তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে—সেটি হলো রথযাত্রা। আউসগ্রামের বাসিন্দা জগন্নাথ বাউরীর আক্ষেপ, আজীবন ভক্তিভরে যে প্রভুর আরাধনা করেন, সেই আরাধ্য দেবতা জগন্নাথের রথের রশি টানার সাধ তাঁর অপূর্ণই থেকে যায়।
পূর্ব বর্ধমানের আউসগ্রামের বেলুটি গ্রামের বাসিন্দা ৪৭ বছর বয়সী জগন্নাথ বাউরী। পরিবারের বড় ছেলে জগন্নাথের জন্মের পর থেকেই দুটি হাত না থাকায় গ্রামের মানুষ তাঁর সঙ্গে প্রভু জগন্নাথ দেবের তুলনা করতেন। বেলুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ভূতনাথ পাল ছোটবেলায় তাঁর পায়ে পেন্সিল গুঁজে দিয়ে লেখা শিখিয়েছিলেন। সেই হাতেখড়ি থেকেই জগন্নাথবাবুর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহের জন্ম। অভাবের সংসারে বড় হওয়া জগন্নাথবাবু কঠিন লড়াইয়ের পর ২০১০ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পান। বর্তমানে তিনি জয়কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
শুধু শিক্ষকতা নয়, জগন্নাথবাবু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি দায়িত্বও একইভাবে পালন করেন। স্ত্রী লক্ষ্মী, বাবা-মা, ভাই ও বোনকে নিয়ে তাঁর ভরা সংসার। তিনি আউসগ্রামের জয়কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পায়ের আঙুলে চক-পেন্সিল গুঁজে বোর্ডে লিখে ছাত্রছাত্রীদের পাঠ দেন। অভিভাবক ও সহকর্মীরা তাঁর এই ইচ্ছাশক্তি ও কর্মদক্ষতার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
প্রতি বছর রথযাত্রা উৎসব আসে বাউরী পরিবারে ভক্তি ও আনন্দের বার্তা নিয়ে। জগন্নাথবাবুর কাছে প্রভু জগন্নাথদেব শুধু দেবতা নন, তিনি তাঁর আরাধ্য এবং জীবনের প্রেরণা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “প্রভু জগন্নাথদেবের দুটি হাত নেই, আমারও নেই। আমি দেবতা না হলেও শারীরিক গঠন তাঁর মতোই। কিন্তু বড় ভক্ত হওয়া সত্ত্বেও হাত না থাকায় রথের রশি টানতে পারি না। এই অপূর্ণতাই প্রতি বছর আমাকে বেদনাতুর করে তোলে।”
তাঁর জীবনের এই কাহিনী যেন একাধারে অনুপ্রেরণার এবং অন্যদিকে এক মর্মস্পর্শী আর্তির। হাত না থাকলেও যে মন দিয়ে ঈশ্বরের সেবা করা যায়, আউসগ্রামের এই শিক্ষক জগন্নাথ বাউরী নিজেই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

